সহস্রাধিক ছাত্র, শ্রমিক, জনতার জীবনের বিনিময়ে আওয়ামী শাসনের আপাত অবসান হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ছিল বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। অথচ শ্রমজীবীদের সবচেয়ে বড় অংশ পরিবহণ শ্রমিকরা বিদ্যমান সমাজে চরম বৈষম্যের শিকার। সড়ক পরিবহণ শ্রমিকরা "শ্রম আইন ও সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮" দ্বৈত আইনে শাসিত হলেও তাদের শ্রম অধিকারের কোন বাস্তবায়ন নাই। মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামো, দৈনিক নির্দ্দিষ্ট কর্মঘন্টা, চাকরির নিশ্চয়তা বা চকরির অবসানে গ্রাচ্যূয়টি প্রদানের শ্রমআইনের বিধানাবলী শ্রমিকদের জন্য বাস্তবায়ন করা হয়না, তারসাথে লাইসেন্স ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি আর হয়রানিমূলক পদ্ধতি গাড়ি চালকদের জীবনকে প্রায় দাসত্বে পরিণত করেছে। বৈষম্যমূলক ভাবে শুধুমাত্র পেশাদার লাইসেন্সের জন্য ডোপটেষ্ট বাধ্যতামূলক করে সামগ্রিক ভাবে গাড়ি চালকদের মর্যাদাহানী এবং হয়রানি বাড়ানো হয়েছে।

ছাত্র সমাজের বৈষম্য মুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৈষম্য মুক্ত সমাজের আকাঙ্খা থেকেই লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী জনতা ছাত্রদের মিছিলে যুক্ত হয়েছে, শত-শত শ্রমজীবী মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছে। শত শত ছাত্র শ্রমিকের আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে সেই সরকারের সামনে আইন সংশোধন করে গাড়ি চালকসহ সকল ধরনের শ্রমিকদের জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে "শ্রম আইন" আর মামলার নামে ট্রাফিক সার্জেন্টের নিপীড়ন বন্ধে "সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮" সংস্কার করার প্রয়োজন খুবই জরুরি।

সকল সড়ক পরিবহণ শ্রমিকের কাজ, আয় ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নিপীড়ন-হয়রানি বন্ধ করার লক্ষ্যে নিম্নের ৭ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরী।

                                                                              ৭ দফা সুপারিশসমুহ

১) শ্রম আইন ও সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ এর সাংর্ঘষিক না হয় তা সংশোধন করে দুই আইনের সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। সেক্ষেত্রে-

ক) শ্রম সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারণে শ্রমিক পক্ষের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

খ) সকল সড়ক পরিবহণ শ্রমিকেরদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

গ) সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮ সংশোধন করে সড়ক নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও ব্যবহারে যুক্ত সকল পক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

ঘ) সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

ঙ) আইনে ট্রাফিক সার্জেন্ট, হাইওয়ে পুলিশের নিপীড়নের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

২) নিয়োগপত্র, কর্মঘন্টা, চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্যমজুরি, অতিরিক্ত কাজের মজুরি, চাকরির অবসানে ক্ষতিপূরণ, উৎসব ভাতা, ছুটি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ শ্রমাধিকারসমূহ আই.এল.ও কনভেনশনের আলোকে সকলের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।

৩) বি.আর.টি.এ এর দুর্নীতি-হয়রানি বন্ধ এবং লাইসেন্স প্রক্রিয়া মানসম্মত করতে হবে। সেক্ষেত্রে-

ক) অন রোড টেস্টিং এর মাধ্যমে চালককে ক্যাটাগরি ভিত্তিক লাইসেন্স দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করে বিআরটিএ-এর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

খ) হয়রানি হ্র্সে পেশাদার চালকরদর লাইসেন্সের মেয়াদ ১০ বছর করতে হবে।

গ)) পেশাদার লাইসেন্সে ডোপ টেষ্ট হয়রানি বন্ধ ও সচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্পট ডোপ টেষ্ট পদ্ধতি চালু এবং প্রয়োজনে প্যাথোলাইজ করতে হবে।

ঘ) প্রতিটি টার্মিনালে হেলথ কেয়ার সেন্টার চালু অথবা প্রতি মাসে অন্তত একবার মেডিক্যাল ক্যাম্প করে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।

৪) সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে পুলিশ, সংবাদ মাধ্যম এবং তদন্ত কমিটির কর্তাব্যাক্তিদের মধ্যে শুধুমাত্র চালকের উপর দায় চাপানোর বিদ্যমান প্রবনতার সংস্কৃতি থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানহুলোকে বের হয়ে আসতে হবে। তাছাড়া-

ক) দুর্ঘটনার রির্পোটগুলি প্রচার করার সময় ড্রাইভার কেন্দ্রিক ধারণাগুলি বন্ধ করতে হবে। অনেক সময় এটা আরও বেশী প্রাণহানির কারণ হয়ে দাড়ায়।

খ) সড়ক দুর্ঘটনা তদন্তে স্বাধীন/স্বতন্ত্র এবং পেশাদারদের নিয়ে তদন্ত কমিটি পুনগঠিত করে রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

গ) প্রাথমিক তদন্তের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে।

ঘ) জাতীয় সড়ক ও মহাসড়ক থেকে ধীর গতির গাড়ি অপসারণ করতে হবে।

ঙ) ওভারলোড পণ্য পরিবহণ বন্ধে সড়ক ও মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ওজন স্কেল বসাতে হবে।

চ) থ্রী হুইলার যানের জন্য সার্বিস রোড চালু করতে হবে।

৫) কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া-

ক) দুর্ঘটনা পরবর্তি শ্রমিকের বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যাবস্থায় শ্রমিকদের হেলথ কার্ড দিতে হবে।

খ) দুর্ঘটনা পরবর্তি পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।

গ) ষ্ট্রেস মেনেজমেন্ট এখন সড়ক শ্রমিকের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাস এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় শ্রমিকদেরষ্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের উপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

৬) সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আনয়নে সারাদেশে সড়ক শ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরী করে শ্রমিকদের হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। তাছাড়া-

ক) শ্রমিক কল্যাণ তহবিল পরিচালনা প্রক্রিয়া সংশোধন করে গাড়ি চালক, কন্ডাক্টর/সুপারভাইজার, হেলপার, কাউন্টার মাস্টারসহ সকল শ্রমজীবীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

খ) দূরপাল্লার যাত্রায় বিকল্প চালক রাখতে হবে। একটানা ৫ ঘন্টার বেশী গাড়ি চালনা যাবে না।

গ) পণ্য পরিবহণ চালকদের/শ্রমিকদের জন্য হাইওয়ের পাশে নিরাপদ ও মান সম্মত বিশ্রামাগার নির্মাণ করতে হবে।

ঘ) বাস টার্মিনালগুলোকে বহুমাত্রিক ব্যাবহারে উপযোগী করতে হবে যাতে যাত্রি পরিবহণ চালক/শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগারসহ বহুতল পাকিং এর ব্যাবস্থা করতে হবে।

ঙ) হাইওয়ে ও এক্সপ্রেক্সওয়ে নির্মাণের পূর্বে ও পরে রোড সেইফটি অডিট করতে হবে এবং রোড সেইফটি মেনেজমেন্টের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।

চ) হাইওয়ে ও এক্সপ্রেক্সওয়ে নির্মাণ বাজেটের ৩%-৫% টাকা সংশ্লিষ্ট রাস্তায় দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিক, যাত্রি, পথচারিদের চিকিৎসা ব্যায় ও নিরাপদ সড়ক সংশ্লিষ্ট প্রচারণা ও প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্ধ রাখতে হবে।

ছ) সরকারি উদ্যেগে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন চালক তৈরী কার্যক্রম নিতে হবে।

জ) সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ছাত্র-বুদ্ধিজীবি-শ্রমিক-জনতা সমন্বয়ে মতবিনিময় সভা, সেমিনার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, লোকালয় ও টার্মিনালে নিয়মিত আয়োজন করতে হবে।

৭) বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আন্দোলনে শহীদ শ্রমজীবীদের প্রতিটি পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, আহতদের চিকিৎসা-পুনর্বাসন-ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাসিস্ট উৎপটনের গণ-অভ্যূত্থানে শ্রমজীবীদের ত্যাগের স্বীকৃতি দিতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও টেকসই প্রতিকার সম্ভব নয়, যদি না শুধুমাত্র চালকদের দোষারোপ করার সংস্কৃতি দূর করা যায়। Work & Health Safety Assistance Center একটি দায়িত্বশীল সংগঠন হিসাবে আমরা মনে করি যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমাগত বিকাশের সময় একটি নিরাপদ সড়ক সবার জন্য অপরিহার্য।