“যে মানুষটি প্রতিদিন হাজারো মানুষের জীবন ও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণ করার পর যদি তাঁর চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে আমাদের শ্রম আইন বাস্তবে কাদের সুরক্ষা দিচ্ছে?”
গত ২ জুলাই ২০২৬ ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত দুইজন চালককে দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম, তা শুধু হৃদয়বিদারক নয়; এটি বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতে শ্রমিক সুরক্ষার করুণ চিত্র।
একজন চালকের একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, অন্য পাটিও কেটে ফেলতে হতে পারে। অপর চালকের একটি পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দুজনই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে রয়েছেন।
কিন্তু আহত চালকদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। দুর্ঘটনার পর মালিকপক্ষ একজনকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। এরপর চিকিৎসার ব্যয়, ওষুধ, অস্ত্রোপচার, পুনর্বাসন কিংবা পরিবারের জীবিকা—কোনোটিরই দায়িত্ব তারা গ্রহণ করেনি।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শ্রমিক যখন মালিকের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন, তখন তার চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব কার?
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন এবং সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। ২০ অনুচ্ছেদে শ্রমকে মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮)-এ কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনাজনিত আঘাত, স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে শ্রমিক বা তাঁর উত্তরাধিকারীর ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ আইনের দৃষ্টিতে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর শ্রমিককে হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে চলে যাওয়াই নিয়োগকর্তার দায়িত্বের সমাপ্তি নয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) দীর্ঘদিন ধরে "Decent Work" এবং "Occupational Safety and Health (OSH)"-এর ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে। ILO-এর মূল নীতি হলো, একজন শ্রমিক নিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজ করবেন এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হলে যথাযথ চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের সুযোগ পাবেন। একটি সভ্য শ্রমব্যবস্থায় দুর্ঘটনার সম্পূর্ণ বোঝা কখনোই একা শ্রমিকের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
বাস্তবে বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতে অধিকাংশ চালকের লিখিত নিয়োগপত্র নেই, চাকরির স্থায়ী রেকর্ড নেই, দুর্ঘটনা বীমা নেই এবং সামাজিক নিরাপত্তার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে দুর্ঘটনার পর আহত শ্রমিককে শুধু শারীরিক যন্ত্রণা নয়, অর্থনৈতিক ধ্বংসেরও মুখোমুখি হতে হয়।
একজন চালক যখন দুই পা হারান, তখন তিনি শুধু একটি অঙ্গ হারান না; তিনি তাঁর পেশা, আয়ের উৎস, আত্মসম্মান এবং পরিবারের ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও হারান। তার সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা, বাসাভাড়া—সবকিছু এক মুহূর্তে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
রাষ্ট্র যদি শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারে, মালিক যদি আইনগত দায়িত্ব পালন না করেন এবং শ্রমিক যদি তাঁর ন্যায্য অধিকার আদায় করতে না পারেন, তাহলে আইনের অস্তিত্ব কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
একজন আহত চালক আমাদের কাছে করুণা চান না; তিনি তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং আইনে স্বীকৃত অধিকার চান।