Center for Work & Occupational Health Safety এর সার্বিক সহযোগিতায় নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর থানার বাসিন্দা ট্রাক চালক ( সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত) মোঃ রাশেদ মিয়া এর স্ত্রী অবশেষে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। গত ২ এপ্রিল ২০২৬ ইং তার সহধর্মিণী মোছা. শারমিন আক্তার আইনানুগ ক্ষতিপূরনের ৫ লক্ষ টাকার চেক টাঙ্গাইল বিআরটিএ অফিস থেকে গ্রহণ করেন।
এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়—এটি প্রমাণ করে যে সংগঠিত প্রচেষ্টা, সচেতনতা এবং আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার আদায় সম্ভব।
আমি গর্বের সাথে জানাচ্ছি, গত ২ বছরে সারা দেশে আমাদের সহযোগিতায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত/আহত সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের জন্য প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটলে নীরব থাকবেন না। আপনার অধিকার সম্পর্কে জানুন, দাবি তুলুন, প্রয়োজন হলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
দুনিয়ার মজদুর এক হও, মেহনতি মানুষের জয় অনিবার্য
আনোয়ার হোসেন ঢাকা
Published: 31 Mar 2026, 11:57 Daily Prothom Alo

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় মোটরসাইকেলের সঙ্গে লাকড়িবোঝাই গাড়ির সংঘর্ষে সাংবাদিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন মারা যান ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর। দুর্ঘটনার পর পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের আবেদন করা হয়। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণ পায়নি ইমরানের পরিবার। ক্ষতিপূরণ পাবে কি না, সেই বিষয়েও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি পরিবারকে।
ইমরানের মা আয়শা বেগম গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ছেলে হারিয়ে তাঁরা এতটাই ভেঙে পড়েন যে স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে। স্বজনদের সহায়তায় তাঁরা চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেন। তিনি কোথায় খোঁজ নেবেন, সেই তথ্য জানা নেই। তাঁর সঙ্গেও কেউ যোগাযোগ করেননি। ফলে ক্ষতিপূরণের আবেদন কোন অবস্থায় আছে, তা তাঁর জানা নেই।
অথচ সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ আইন অনুসারে, আবেদন করার পর ক্ষতিপূরণের অর্থ দুই মাসের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ব্যাংক হিসাবে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সময়মতো ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা।
বিআরটিএর হতাহতের হিসাব বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর পর থেকে যত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, এর মধ্যে মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এ সময় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে সড়কে হতাহত আরও বেশি।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকার ও আহত ব্যক্তিদের অনুকূলে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। এই তহবিল পরিচালনা করে একটি ট্রাস্টি বোর্ড। এ আইনের বিধিমালা ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। বিধিমালায় ট্রাস্টি বোর্ড গঠন, তহবিল সংগ্রহ, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এবং তা বিতরণের পদ্ধতি সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। নিহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেলে ভুক্তভোগী ব্যক্তির পরিবার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা পাবে। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানি হলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি পাবেন তিন লাখ টাকা। আহত কারও চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকলে আর্থিক সহায়তা তিন লাখ টাকা। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকলে পাবেন এক লাখ টাকা।
সড়ক আইনের বিধিমালা কার্যকরের দিন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আবেদন জমা নেওয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর ১৬২ জনকে আর্থিক সহায়তার চেক হস্তান্তরের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু হয়।
ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরুর ছয় মাসের মাথায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে আবেদন করেন বাগেরহাটের বনি আমিন। তাঁর ভাই মো. গোলাম রসুল ওই বছরের ১৯ এপ্রিল দুর্ঘটনায় মারা যান। গোলাম রসুল ছিলেন পেশায় একটি মাদ্রাসার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মারা যাওয়ার দুই দিন পর গোলাম রসুলের স্ত্রী একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন।
বনি আমিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি পেশায় গ্রাম পুলিশ। ভাই মারা যাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেন। এরপর নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে হয়ে যাবে, হচ্ছে বলে ঘোরাচ্ছেন বিআরটিএ কর্মকর্তারা। অথচ তাঁর পরে আবেদন করে কেউ কেউ টাকা পেয়েছেন বলে জেনেছেন।
বিআরটিএর হিসাবে ২০২৩ সাল থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার জন। এ সময় আহত হয়েছেন ২০ হাজার ৪৮৩ জন।
ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন কম
ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালিত হয় বিআরটিএ কার্যালয় থেকে। ট্রাস্টি বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শুরু থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৬৪১টি চেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ১৯৫ জন নিহতের পরিবার। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন ৩১৬ জন। গুরুতর আহত ব্যক্তি হিসেবে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ১৩০ জন। সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে ১১৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
বিআরটিএর হিসাবে ২০২৩ সাল থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার জন। এ সময় আহত হয়েছেন ২০ হাজার ৪৮৩ জন।
বিআরটিএর হতাহতের হিসাব বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর পর থেকে যত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, এর মধ্যে মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এ সময় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে সড়কে হতাহত আরও বেশি।
প্রচারের অভাবে মানুষ ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সাইফুল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তহবিলে টাকা আছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এর প্রচার করা দরকার, এমনকি আবেদনটি যাতে সরকারি উদ্যোগে নেওয়া হয়, সেটিও করা যায়।
হয়রানি, প্রক্রিয়াগত জটিলতা
ক্ষতিপূরণের আবেদন করার পর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও টাকা পায়নি টাঙ্গাইলের সিরাজ মিয়ার পরিবার। মুদিদোকানি সিরাজ মিয়া ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর অটোরিকশা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
সিরাজ মিয়ার ছেলে আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করার পর তাঁর ফোন নম্বর রেখে দেওয়া হয়। বিআরটিএর লোক বলে পরিচয় দিয়ে একজন কয়েক মাস আগে ফোন দিয়ে জানান, এক লাখ টাকা ঘুষ দিলে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আনোয়ার বলেন, তাঁদের টাকা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই আর যোগাযোগ করেননি।
গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস এম মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সিরাজ মিয়ার পক্ষে নির্ধারিত সময়ের ১২ দিন পর আবেদন করা হয়। এরপরও তাঁদের কার্যালয় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন বাকি দায়িত্ব ট্রাস্টি বোর্ডের। গাজীপুর কার্যালয়ের কোনো কাজ আর নেই।
ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে গড়িমসি কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়
অধ্যাপক সামছুল হক, পরিচালক, সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বুয়েট
শুরুতে বিধিমালায় আর্থিক সহায়তা পেতে নির্ধারিত ফরমে দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করার কথা বলা হয়। এত স্বল্প সময়ের কারণে অধিকাংশ ব্যক্তিই আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে। তবে গত বছর জানুয়ারির পরে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর জন্য প্রযোজ্য হবে। আগেরগুলো এর আওতায় পড়বে না।
আবেদনের পর অনুসন্ধান কমিটি ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনকারীর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম। প্রতিবেদন দাখিলের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ট্রাস্টি বোর্ড আবেদনকারীর ব্যাংক হিসাবে ‘প্রাপকের হিসাবে প্রদেয়’ চেকের মাধ্যমে টাকা দেবে, অর্থাৎ দুর্ঘটনার দুই মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের কাজ করা হয়। এই দুই দপ্তরে আরও নানা কাজ থাকে। দপ্তরপ্রধানেরাও ব্যস্ত থাকেন। বিআরটিএ কর্মকর্তারাও গড়িমসি করেন। ফলে সময়মতো ক্ষতিপূরণের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় না।
ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তদন্ত করে সুপারিশের জন্য ১৪ সদস্যের স্থায়ী কমিটি রয়েছে। ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমিটির প্রধান। বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সহকারী পরিচালক সদস্যসচিব। পুলিশ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে আছেন।
ক্ষতিপূরণটা পেলে দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের কিছুটা হলেও উপকার হয়। এ টাকা দিতে গড়িমসি কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা ঠিকভাবে না করতে পারলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
তহবিলে টাকা আছে, খরচ কম
ট্রাস্টি বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট পর্যন্ত তহবিলে জমা আছে ২৫৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সড়ক পরিবহন আইনে ক্ষতিপূরণের জন্য গঠিত তহবিলের টাকা কোন কোন খাত থেকে আসবে, তার বিস্তারিত বলা আছে বিধিমালায়। খাতগুলো হলো সরকারের দেওয়া অনুদান, মোটরযানের মালিকের কাছ থেকে তোলা চাঁদা, সড়ক পরিবহন আইনের মাধ্যমে আদায় করা জরিমানার একটি অংশ, মালিক সমিতির অনুদান, শ্রমিক সংগঠন বা শ্রমিক ফেডারেশনের অনুদান, অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে পাওয়া অর্থ। তবে এখন পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহনের মালিকের কাছ থেকেই চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিপূরণটা পেলে দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের কিছুটা হলেও উপকার হয়। এ টাকা দিতে গড়িমসি কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা ঠিকভাবে না করতে পারলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।