সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সড়কে সংঘটিত সব দুর্ঘটনার জন্যই চালক ও হেলপারকে দায়ী করার প্রবণতা রয়েছে। এই প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি,) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ওয়ার্ক অ্যান্ড হেলথ সেফটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেন্টার এই আয়োজিত ‘বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা প্রশমনে কতটুকু কার্যকর’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে দেশের বিভিন্ন রুটের দূরপাল্লার গাড়ি চালকরা অংশ নেন।
সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালককে দায়ী করার প্রবণতা রয়েছে। এসব দুর্ঘটনার জন্য চালক-হেলপার দায়ী থাকেন না। বিভিন্ন কারণে সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে থাকে। এর জন্য সড়ক অবকাঠামো, গাড়ি, পথচারী, চালকও দায়ী থাকে। বিচার ছাড়া চালককে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় চালক দোষী হলে তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে শান্তি দিতে হবে। কিন্তু দুর্ঘটনাস্থলে চালককে দোষী বলা বা গ্রেপ্তার করা যাবে না।
এ সময় শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, সবচেয়ে দামি গাড়িতে দামি মানুষ চলেন। আর সেসব দামি মানুষকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর দায়িত্ব থাকে চালকদের ওপর। চালকের মনে যত কষ্টই থাকুক তার কাজ যাত্রীদের সেবা দেওয়া। চালকের প্রতি রাষ্ট্র ও গাড়ি মালিকের দায়িত্ব রয়েছে। গাড়ির চাকা ঘুরলে মালিকের পকেটে টাকা আসে। সে চাকা যে ঘুরায় তার দায়িত্ব মালিককে নিতে হবে। তিনি বলেন, চালকের বিশ্রাম নেওয়ার দরকার কতটুকু আর সে তুলনায় সুযোগ কতটা আছে সেটা দেখতে হবে। শুধু চালকদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেশের পরিবহণ ব্যবস্থা ভালো হবে না।
হৃদ্রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. জয়ন্ত মালাকার শ্রমিকদের স্ট্রেস মেনেজমেন্ট করতে হলে প্রথমেই শ্রমিকদের শ্রম আইন অনুযায়ি ৮ কর্ম ঘন্টা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের কর্মঘন্টা নিশ্চিত না হলে সব আয়োজন বাস্তবায়ন সম্ভব হনে না। আমরা শ্রমিকদের নামমাত্র মূল্যে ওয়ার্ক এন্ড হেল্থ সেইফটি এসিসটেন্ট সেন্টারের সদস্যদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার দেয়া যায় তা প্রক্রিয়াধীন আছে। খুব শীঘ্রই এই কার্যক্রম চালু করবো।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ক অ্যান্ড হেলথ সেফটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেন্টারের প্রধান সমন্বয়কারী মো. সেলিম।
বৈঠকে আরও অংশ নেন বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক, বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ, বিআরটিএ পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শীতাংশু শেখর বিশ্বাস, সাংবাদিক মাসুদ কামাল, হৃদ্রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. জয়ন্ত মালাকার এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নাসির উদ্দিন আহমেদ জুয়েল।
মূল প্রবন্ধ
“বিদ্যমান সড়ক ব্যাবস্থাপনা দুর্ঘটনা প্রশমনে কতটুকু কার্যকর”?
“Work & Health Safety Assistant Center” পক্ষ থেকে সবাইকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। আমরা জানি সড়ক ব্যবস্থাপনার সাথে অবকাঠামো, চালক, মালিক, বিআরটি-এ কর্তৃপক্ষ বা সরকার, যাত্রী, পথচারী বা সাধারণ জনগণ, প্রশিক্ষণ, চাকরির বিধি, দুর্ঘটনা তদন্তের প্রক্রিয়া, সড়ক নির্মাণ, ডিজাইন ও ব্যবহার, ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, আইন-আদালত ইত্যাদি অনেক কিছু যুক্ত আছে। ফলে সড়কের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য এগুলো একটা ব্যবস্থাপনার অধিনে ও যথোপযোগী প্রক্রিয়ায় না নিয়ে এসে সড়ক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে কি? আর দশটা আয়োজন মিলে যে ব্যবস্থা তৈরি হয় তার নয়টি সঠিক না রেখে বা সঠিকভাবে সমন্বয় না করে শুধু একটির দিকে দৃষ্টি রাখলে বা দোষারোপ করলে তাতে সুফল বা সমাধান কোনটাই আসে না।
প্রথমত ঃ যে সড়কে যানবাহন চলবে সে সড়ক কেমন? যে যানবাহনগুলো চলবে সেগুলির গতি-প্রকৃতি কেমন? ফিটনেস বা চলার সামর্থ্য কেমন? ফিটনেস যারা যাচাই করবেন, তাদের এবং প্রতিষ্ঠানের যথার্থ দক্ষতা আছে কি না? যারা চালক তাদের চালাবার সনদ রয়েছে কি না? চালকের মানসম্মত ট্রেনিং ও পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান আছে কী না? সড়ক ও যানবাহনের অনুপাত কেমন? গাড়ি দাঁড়াবার স্থান (পার্কিং) পরিসর কেমন? যাত্রীদের অপেক্ষা ও বিশ্রামস্থল কীভাবে কি বিবেচনায় নির্ধারিত? পথচারীদের চলাচল গতিবিধি কেমন? ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কেমন? স্বয়ংক্রিয় সিগনাল ও গণঅভ্যস্থতা কোন পর্যায়ে?
দ্বিতীয়ত ঃ দেশে মহাসড়ক, সড়ক, শাখা সড়ক, সংযোগ সড়ক এগুলোর সংজ্ঞা ও যথার্থতা কি আছে? এগুলোর আলাদা আলাদা বৈশিষ্টগত অবস্থান ও ব্যবহার কি আছে? এখন যদি মহাসড়কের কথা বলা হয়, তার পাশে লাগোয়া অবস্থানে বাজার, লোকালয়, মানুষের ঘরবাড়ি থাকে কি করে? সড়ক, সংযোগ সড়ক, মহাসড়কের সাথে রেল স্টেশন, শিল্পাঞ্চল, বন্দর, ঘাট, বাজার ইত্যাদির সাথে কীভাবে, কী নিয়মে যুক্ত হবে? যাত্রী ওঠা-নামার ব্যবস্থা, মালামাল লোড আনলোড, পার্কিং কেমন হবে ইত্যাদির পরিষ্কার ধারণা আছে কি না? মহাসড়কে গাড়ির সর্বোচ্চ গতি কত এবং বিভিন্ন গতির লেন, স্বল্প গতির যানবাহন ইত্যাদির আলাদা লেন, বেরিয়ে যাবার লেন, আন্ডারপাস, ওভারপাস ইত্যাদি মিলে আমাদের মহাড়কের অবস্থা কী আছে? ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এগুলোর একটা ব্যবস্থাপনা না করে খন্ডিত নির্দেশনা যথার্থ হতে পারে কি?
তৃতীয়ত ঃ গাড়ির ফিটনেস দেয়ার ক্ষেত্রে বি.আর.টি.এ-র সে সক্ষমতা কতটুকু আছে ? বিআরটিএ যে এক দিনে শত শত গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট দিচ্ছে, এক দিনে শত গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দেয়ার সক্ষমতা বিআরটিএ-এর কতটুকু আছে?
চতুর্থত ঃ যেহেতু শ্রমিকরা ঝুকিপূর্ণ কাজ করেন সেহেতু চালকরা যেখান থেকে যাত্রা শুরু করে বা শেষ করে সেখানে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক আছে কি না?
পঞ্চমত ঃ চালকের মনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা দিয়ে শাস্তির বিধান হলে সতর্কতা বাড়ে অন্যথায় সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। তাতে ঝুঁকি বাড়ে। আমরা যখন আইনের কথা বলি তখন আসলে নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলি। যে নিয়ম মানুষের স্বচ্ছন্দ বিকাশ ও সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করে আর এর সামনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে। জনগণের সেবা সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যে আইন রচিত হয় তা হয় গণতান্ত্রিক। আর মুষ্টিমের স্বার্থে জনগণের স্বার্থ সেবাকে কম গুরুত্বে রেখে যে আইন হয় তা অগণতান্ত্রিক বিবেচিত। সড়ক আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে আনা হলো না, এটা আইন হয় কেমন করে? শ্রম আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষকে না আনলে আইনের কার্যকারিতা সম্পন্ন হবে কি?
ষষ্ঠত ঃ আপনারা সকলেই জানেন শ্রমিকরা পথে প্রত্যক্ষ নিম্নরুপ চ্যালেজ্ঞ নিয়ে গাড়ি চালাতে বাধ্য হন, যেমন -
১. মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম
২. অতিরিক্ত কর্মঘন্টা
৩. ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা
৪. ত্রুটিপূর্ন যানবাহন
৫. সড়কের অব্যাস্থাপনা
৬. অধিক আয়ের তাগিদ
৭. যাত্রি ও মালিকের দুর্ব্যবহার
৮. অস্বাস্থকর খাদ্য ও পরিবেশ
৯. পথে পথে প্রশাসনিক হয়রানি ও চাঁদাবাজি
১০. পথে পথে ভিবিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি
১১. সড়ক আইনের অতিরিক্ত জরিমানা ও জামিন অযোগ্য ধারা
১২. দুর্ঘটনায় আহত/নিহত হওয়া
১৩. পথচারির/সাধারণ সানুষের সহিংতায় আহত বা নিহত হওয়া
১৪. রাজনৈতিক সহিংতায় আক্রান্ত হয়ে আহত বা নিহত হওয়া।
১৫. ডাকাতের কবলে পড়ে আহত/নিহত হওয়া।
এই সংকটগুলো মোকাবেলায় কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছি কি?
সপ্তমত ঃ প্রতিদিন পত্রিকা বা টিভি খুললে যে খবর সকলকে আতঙ্কগ্রস্ত ও ক্ষুদ্ধ করে তোলে তার মধ্যে অন্যতম হলো সড়ক দুর্ঘটনা আর দুর্ঘটনায় মৃত্যু। প্রতিদিনই ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া সুস্থ্য, সবল, স্বাভাবিক, কর্মক্ষম পরিবহণ শ্রমিক, যাত্রী, পথচারি কেউ ফিরছেন পঙ্গু হয়ে, কেউবা লাশ হয়ে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫/১৬ জন মানুষের মৃত্যু আর তার চেয়েও বেশী মানুষের পঙ্গুত্বের কারণ এই সড়ক দুর্ঘটনা। কিন্তু এই দুর্ঘটনা ও মৃত্যু আমাদের যতটা ক্ষুদ্ধ করে ততটা সচেতন করে কি? যদি জিজ্ঞেস করা হয় এই সড়ক দুর্ঘটনার কারণ কি? সবাই এক বাক্যে বলে বেপরোয়া গাড়ি চালনা এবং দায়ী হলো ঘাতক গাড়ির চালক। অথচ প্রতিটি সড়ক (দুর্ঘটনার) ক্র্যাশের পটভূমি থাকে, তা কেউ জানতে চায় না। রাস্তার উপর একটা ছোট গর্তও যে একটা ভয়ানক সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে তা আমরা ক,জনই জানার চেষ্টা করি?
সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা যত বাড়ছে গাড়ির চালক ও পরিবহণ শ্রমিকদেরকে দায়ী করার প্রবনতাও তত বাড়ছে। নেতিবাচক প্রচারনার জোয়ারে সমাজে পরিবহণ শ্রমিকদেরকে শত্রু বা দানব ভাবার মনন তৈরী হয়েছে। এই ঘৃনার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে যুক্তি, দুর্বল হচ্ছে কারণ অনুসন্ধানের মানসিকতা এবং দূরে সরে যাচ্ছে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ। দুর্ঘটনাকে অপরাধ বলে বিবেচনা করা আর পরিবহণ শ্রমিকদেরকে খুনি হিসেবে চিহ্নিত করা দুটোই চলছে সমানতালে। তাদের জীবনের কষ্ঠ, কর্মক্ষেত্রে সমস্যার কথা আলোচনা না করলেও, তাদের কিভাবে ও কতভাবে শাস্তি দেয়া যায় সে বিষয়ে উৎসাহের অভাব নাই। অথচ পরিবহণ শ্রমিকরা জনগণ ও যাত্রিদের প্রতিপক্ষ নয়, বরং তাদের যাতায়াত সহায়তাকারি। কোন দায়িত্বশীল মানুষ পরিবহণ খাতের প্রয়োজন অস্বীকার করেন না। এই সেবামুলক খাত আর ৭০ লাখ সড়ক পরিবহণ শ্রমিককে গুরুত্ব না দিয়ে দেশের অর্থনীতির বিকাশ ও সড়ক পরিবহণ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কি সম্ভব?
অস্টমত ঃ এখন দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত হয়। যে কোন ধরনের পুলিশ দিয়ে তদন্ত সুষ্ঠ হবে কি? যিনি তদন্ত করবেন, দুর্ঘটনার সকল কার্যকারণ তার জানা আছে কি? যে গাড়ির ফিটনেস নাই বিআরটিএর কোন কর্মকর্তা যদি সে গাড়িকে ফিট বলে সার্টিফিকেট দিয়ে রাস্তায় চলতে দেয় তার কী সাজা হবে? এই ধরণের বহু বিষয় উপেক্ষায় অবহেলায় রেখে শুধু ফাইনের আইন কতোটা ফল দেবে বা সড়কে দুর্ঘটনা প্রশমন করবে তা আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
শ্রমজীবীদের সবচেয়ে বড় অংশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক। অথচ সড়ক শ্রমিকরা বিদ্যমান সমাজে চরম বৈষম্যের শিকার। সড়ক পরিবহণ শ্রমিকরা "শ্রম আইন ও সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮" দ্বৈত আইনে শাসিত হলেও তাদের শ্রম অধিকারের কোন বাস্তবায়ন নাই। মর্যাদপূর্ণ বেতন কাঠামো, দৈনিক নির্দ্দিষ্ট কর্মঘন্টা, চাকরির নিশ্চয়তা বা চাকরির অবসানে গ্রাচ্যূয়টি প্রদানের শ্রম আইনের বিধানাবলী শ্রমিকদের জন্য বাস্তবায়ন করা হয় না, তার সাথে লাইসেন্স ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি আর হয়রানিমূলক পদ্ধতি গাড়ি চালকদের জীবনকে প্রায় দাসত্বে পরিণত করেছে। বৈষম্যমূলক ভাবে শুধুমাত্র পেশাদার লাইসেন্সের জন্য ডোপটেষ্ট বাধ্যতামূলক করে সামগ্রিক ভাবে গাড়ি চালকদের মর্যাদাহানী এবং হয়রানি বাড়ানো হয়েছে।
সকল সড়ক পরিবহণ শ্রমিকের শোভন কাজ, আয় ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নিপীড়ন-হয়রানি বন্ধ করার লক্ষ্যে “Work & Health Safety Assistant Center” ২০২১ সাল থেকে সারাদেশে কর্মরত অভিজ্ঞ চালকদের নিয়ে শ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরী, সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা পরামর্শ, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত/নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বিনামূল্যে ক্ষতিপূরণ আদায়ে সহযোগীতা প্রভৃতি কাজ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের এই গোল-টেবিল আলোচনা সভা।
সড়ক পরিবহণে বৈষম্যহীন কর্ম পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সুপারিশ
১) শ্রম আইন ও সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ এর সাংর্ঘষিক না হয় তা সংশোধন করে দুই আইনের সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। তাছাড়া-
ক) সড়ক আইনে ওয়ারেন্ট ব্যতীত গ্রেফতারের ক্ষমতা ধারা ১১০, অজামিনযোগ্য ধারা ১০৫ বাতিল করে জামিনযোগ্য এবং সকল সড়ক পরিবহণ শ্রমিকেরদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
খ) সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮ সংশোধন করে সড়ক নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও ব্যবহারে যুক্ত সকল পক্ষকে জবাবদিহিতা ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গ) সড়ক ব্যাবস্থাপনা আধুনিক না করে সড়ক শ্রমিকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কর্তন ও অতিরিক্ত জরিমানার বিধান বাতিল করতে হবে।
ঘ) আইনে ট্রাফিক সার্জেন্ট, হাইওয়ে পুলিশের নিপীড়নের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
ঙ) গতিসীমা মানতে প্রতিটা রাস্তায় সর্বোচ্চ গতিসীমা উল্লেখ করে সাইন বোর্ড স্থাপন করতে হবে।
চ) সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
২) ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ শ্রমাধিকারসমূহ আই.এল.ও এর নির্ধারিত শ্রমমানের আলোকে সকলের জন্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শ্রম আইনানুযায়ি শ্রমিকদের নিয়োগপত্র না প্রদান করিলে মালিক, কতৃপক্ষ বা পরিচালনাকারি প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির বিধান করতে হবে। তাছাড়া-
ক) শ্রমিকদের নিম্নতম মুজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। প্রতি ট্রিপে নিরাপদ গাড়ি চালনার জন্য ইনসেনটিভ এর ব্যাবস্থা করতে হবে। আইনানুযায়ি প্রত্যেক শ্রমিকের নিয়োগের সমস্ত শর্ত/চুক্তি উল্লেখ করে বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র প্রদান ও তা পর্যবেক্ষনের ব্যাবস্থা করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন/বিআরটিএ/সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষতে রাস্তায় গাড়ির কাগজপত্র, চালকের লাইসেন্স একই সাথে বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমিকের নিয়োগপত্র যাচাই করতে হবে।
খ) শ্রমিকদের অবাদ ট্রেড ইউনিয়ন চর্চা/গঠনের সুযোগ তৈরী করতে হবে। টার্মিনালে অপেশাদার অশ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রণ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
গ) শ্রমিকের অবসরের বয়সসীমা নির্ধারণ করে অবসরকালীণ ভাতা (এককালিন/মাসিক ) নির্ধারণ করতে হবে।
ঙ) দৈনিক কর্মঘন্টা নির্ধারণ করতে হবে, সাধারণভাবে দৈনিক ৩০ মিনিট বিরতি দিয়ে একটানা ৬ ঘন্টার বেশী গাড়ি চালনা যাবে না। জরুরী প্রয়োজনে আরো দুই ঘন্টা গাড়ি চালাতে পারবে তবে তার জন্য ওভার টাইম হিসেবে অতিরিক্ত মুজুরি দিতে হবে। দূরপাল্লার যাত্রায় বিকল্প চালক রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চ) ষ্ট্রেস মেনেজমেন্ট এখন সড়ক শ্রমিকের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাস এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় শ্রমিকদের ষ্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের উপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি টার্মিনালে হেলথ কেয়ার সেন্টার চালু অথবা প্রতি মাসে অন্তত একবার মেডিক্যাল ক্যাম্প করে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।
৩) বি.আর.টি.এ এর দুর্নীতি-হয়রানি বন্ধ এবং লাইসেন্স প্রক্রিয়া মানসম্মত করতে হবে। তাছাড়া-
ক) অন রোড টেস্টিং এর মাধ্যমে চালককে ক্যাটাগরি ভিত্তিক লাইসেন্স দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করে বিআরটিএ-এর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
খ) হয়রানি বন্ধে পেশাদার চালকদের লাইসেন্সের মেয়াদ ১০ বছর করতে হবে।
গ) পেশাদার লাইসেন্সে ডোপ টেষ্ট হয়রানি বন্ধ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্পট ডোপ টেষ্ট পদ্ধতি চালু এবং প্রয়োজনে প্যাথোলাইজ করতে হবে।
৪) সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে পুলিশ, সংবাদ মাধ্যম এবং তদন্ত কমিটির কর্তাব্যাক্তিদের মধ্যে শুধুমাত্র চালকের উপর দায় চাপানোর বিদ্যমান প্রবনতার সংস্কৃতি থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বের হয়ে আসতে হবে। তাছাড়া-
ক) দুর্ঘটনার রির্পোটগুলি প্রচার করার সময় ড্রাইভার কেন্দ্রিক ধারণাগুলি বন্ধ করতে হবে। অনেক সময় এটা আরও বেশী প্রাণহানির কারণ হয়ে দাড়ায়।
খ) ক্যাটাগরি ভিত্তিক লাইসেন্স নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তজেলা বাস/ট্রাক সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হওয়ার পর মামলায় লাইসেন্সের ক্যাটাগরিকে প্রধান্য বা আমলে নেয়া যাবে না। প্রাথমিক তদন্তের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে।
ঘ) সড়ক দুর্ঘটনা তদন্তে স্বাধীন/স্বতন্ত্র এবং পেশাদারদের নিয়ে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠিত করে রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ) মোটর সাইকেল/থ্রী হুইলার যানের জন্য সার্ভিস রোড চালু করতে হবে। জাতীয় সড়ক ও মহাসড়ক থেকে ধীর গতির গাড়ি অপসারণ করতে হবে।
ছ) ওভারলোড পণ্য পরিবহণ বন্ধে সড়ক ও মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ওজন স্কেল বসাতে হবে।
৫) কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া-
ক) দুর্ঘটনা পরবর্তি শ্রমিকের বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যাবস্থায় শ্রমিকদের হেলথ কার্ড দিতে হবে।
খ) দুর্ঘটনা পরবর্তি পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজতর করার লক্ষ্যে সড়ক আইন ২০১৮ সংশোধন করে ৩০ দিনের আবেদনের সময়সীমা বাতিল এবং ক্ষতিপুরণ প্রাপ্তির সময়সীমা ৩০ কার্য দিবস নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলা দৃশ্যমান হলে তাদের শাস্তির বিধান আইনে যুক্ত করতে হবে। দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু বা স্থায়িভাবে পঙ্গু হলে ক্ষতিপূরণ আজীবন আয়ের সমান/৫০ লক্ষ টাকা করতে হবে।
গ) হাইওয়ে ও এক্সপ্রেক্সওয়ে নির্মাণ বাজেটের ৩%-৫% টাকা সংশ্লিষ্ট রাস্তায় দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিক, যাত্রি, পথচারিদের চিকিৎসা ব্যায় ও নিরাপদ সড়ক সংশ্লিষ্ট প্রচারণা ও প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্ধ রাখতে হবে।
৬) সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আনয়নে সারাদেশে সড়ক শ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরী করে শ্রমিকদের হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। তাছাড়া-
ক) শ্রমিক কল্যাণ তহবিল পরিচালনা প্রক্রিয়া সংশোধন করে গাড়ি চালক, কন্ডাক্টর/সুপারভাইজার, হেলপার, কাউন্টার মাস্টারসহ সকল শ্রমজীবীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
খ) পণ্য পরিবহণ চালকদের/শ্রমিকদের জন্য হাইওয়ের পাশে নিরাপদ ও মান সম্মত বিশ্রামাগার নির্মাণ করতে হবে।
গ) বাস টার্মিনালগুলোকে বহুমাত্রিক ব্যাবহারে উপযোগী করতে হবে যাতে যাত্রি পরিবহণ চালক/শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগারসহ বহুতল পাকিং এর ব্যাবস্থা থাকে।
ঘ) হাইওয়ে ও এক্সপ্রেক্সওয়ে নির্মাণের পূর্বে ও পরে রোড সেইফটি অডিট করতে হবে এবং রোড সেইফটি মেনেজমেন্টের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
ঙ) সরকারি উদ্যেগে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন চালক তৈরী কার্যক্রম নিতে হবে।
চ) সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ছাত্র-বুদ্ধিজীবি-শ্রমিক-জনতা সমন্বয়ে মতবিনিময় সভা, সেমিনার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, লোকালয় ও টার্মিনালে নিয়মিত আয়োজন করতে হবে।
আমরা খসড়া হিসেবে আমাদের মতামতগুলো আপনাদের মাঝে তুলে ধরলাম। আপনাদের সুচিন্তিত মতামত নিয়ে আমরা এটা চুরান্ত করে পরবর্তি কর্মসূচি নেব।
সকলকে ধন্যবাদ
মো. সেলিম
প্রধান সমন্বয়কারী