ভূমিকা ঃ কোন দেশের অর্থনীতির গতি প্রবাহ, সড়কপথে নিরাপদ ভ্রমণ, পণ্য পরিবহণ ও পরিবহণ শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন এক সুত্রে গাঁথা। পরিবহণ ব্যবস্থা অনেকটা শরীরের রক্ত প্রবাহের মত। রক্ত প্রবাহ বন্ধ হলে যেমন শরীরের কোন অঙ্গই সচল থাকতে পারে না তেমনি পরিবহণ ব্যবস্থা অচল হলে দেশের কৃষি শিল্প সেবা সব খাত অচল হয়ে যেতে বাধ্য। যদিও পরিবহণ খাত বলতে নৌ, রেল, সড়ক, বিমান সব খাতকেই বুঝায় কিন্তু বর্তমানে আমাদের আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু সড়ক পরিবহণ খাত। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ কোটি যাত্রী, খাদ্য (ধান, চাল, সব্জি, ফল, চিনি, তেল,চা, মাছ, গরু-ছাগল, মুরগি, ডিম ইত্যাদি) সহ জ্বালানী তেল, ভোজ্য তেল, রড, সিমেন্ট, বালি ইত্যাদি মিলে বার্ষিক ১০ কোটি টনের বেশি পণ্য পরিবহণ, ৪৩ লাখের বেশি যানবাহন আর ৭০ লাখের বেশি শ্রমিক নিয়ে বিশাল এই পরিবহণ জগত। হাজার হাজার কোটি টাকা যানবাহন কিনতে বিনিয়োগ, প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভাড়া বাবদ আয়, আর সরকারের বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের খাত এই পরিবহণ সেক্টর।
অশিক্ষিত/স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিক, শক্তিশালী মালিক, চাঁদাবাজি এবং নিরুপায় যাত্রী নিয়ে এই খাত সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। সড়কে দুর্ঘটনা আতংকিত করে তুলছে সবাইকে। কিন্তু সরকার, কতৃপক্ষ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী অপরাপর শ্রেণী পেশার মানুষ দুর্ঘটনার শাস্তি নিয়ে যতটা সরব, দুর্ঘটনার কারণ দূর করার প্রচেষ্টা ততটা দৃশ্যমান হয়ে উঠে না।
পরিবহণ শ্রমিক ঃ আমাদের অভিবাকগণ (এমন কি পরিবহণ শ্রমিকরাও) কেউই তাদের সন্তানদের বাস কিংম্বা ট্রাকের চালক হওযার জন্য উৎসাহিত করেন না। প্রতিটা মাতা-পিতা তাদের বাচ্চাদের সর্বোচ্চ পাইলট (বিমান চালক) বা ক্যাপ্টেইন (জাহাজ চালক) হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন কিন্তু বাস বা ট্রাকের চালক হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন না। কাজেই ৭০ লাখের বেশি পরিবহণ শ্রমিক এবং ১০ লাখের মত মোটর মেকানিকগণ প্রায় প্রত্যেকেই অভাবের তারনায় কাজের অন্য কোন পথ খুজে না পেয়ে এই ঝুকিপূর্ন পেশায় এসেছেন। যদিও এদের বড় একটা অংশ পরিবহণ শ্রমিকদেরই সন্তান বা আত্মিয়-স্বজন। তবে এখন পরিবহণ শ্রমিকরা তাদের সন্তানদের পড়াশুনা করানোর চেষ্টা করেন আর চালক বা পরিবহনে পারতঃপক্ষে কাজে আসতে নিরুৎসাহিত করেন।
শিশু শ্রমিক ঃ বাংলাদেশে নগরায়নে ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়ার কারণে, বিশেষ করে পরিবহণ খাতে শিশুশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ। ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুরা সব ধরণের যানবাহনে বিশেষ করে গণপরিবহণে যেমন বাস, মিনি-বাস, মিনি-ট্রাক, হিউম্যান হলার ইত্যাদিতে ব্যাপক হারে কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, এই ছোট বাচ্চারা দারিদ্র্যতা, পারিবারিক সংকট, পারিবারিক সহিংসতা, ঋণগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদিœ কারণে এই পেশায় যুক্ত হয়। দারিদ্রতা এই শিশু কিশোরদের পরিবহণ জগতে টেনে আনে। যে বয়সে স্কুল কলেজে গিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন-সাহিত্য পড়ার কথা সে বয়সে জীবনের পাঠশালায় পরিবহণ শ্রমিকরা শিখে কয়েকটা টাকার জন্য কি কঠিন ও অমানবিক পরিশ্রম করতে হয়। তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ছেড়ে এই সেক্টরে সাহায্যকারী, কন্ডাক্টর বা দারোয়ান হিসেবে যুক্ত হতে হয়। তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে যে, এই কাজের মাধ্যমেই তারা একদিন ড্রাইভার হবে এবং চাকরি পাবে। তারা তাদের চিন্তাকে টার্মিনালে সীমাবদ্ধ রাখে এবং অগোছালোভাবে বেড়ে ওঠে। এই শিশুরা তাদের সারাদিন বাস বা ট্রাকে চালকের সাথে কাটায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের টার্মিনালে বাসড়কে পার্ক করা গাড়িতে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। কখনও কখনও তারা ড্রাইভারকে তাদের গাড়ি চালাতে দেখাতে বলে এবং এক সময় তারা বাস বা ট্রাক পার্ক করার সুযোগ পায়। সাধারণত, বাংলাদেশ পরিবহণ শিল্পে চালক হওয়ার জন্য এটি একটি সাধারণ পদ্ধতি বা পাইপলাইন। যে কারণে, এই ব্যাবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা বিদ্যমান।
প্রথমত, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার যা এই টার্মিনাল ছেলেদের জন্য নিশ্চিত করা হয়নি। এই কারণে, তারা একটি ক্ষুদ্র ভবিষ্যতের সাথে বড় হয় এবং তাদের স্বপ্ন চালক হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এই প্রক্রিয়ায় তারা শুধুমাত্র গাড়িটাকে কিভাবে রাস্তায় মেনেজ করে করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে সেটা আয়ত্ব করে। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নাই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার/সমাজের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা নাই। সুস্থ বিনোদন নাই। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, বিশ্রাম ও সুষম খাদ্যেরও নুন্যতম ব্যাবস্থা নাই। পক্ষান্তরে এই পরিবহণ শ্রমিকরা প্রতিদিন সমাজের, যাত্রীর, মালিকের, এমনকি অনেক শ্রমিক নেতাদের তাচ্ছিল্য আর ঘৃণাকে সঙ্গী করেই কাজ করতে বাধ্য হয়। ফলে তাদের মধ্যে সমাজের অপরাপর অংশের মানুষের প্রতি এক ধরণের তীব্র চাপা ক্ষোভও বিরাজ করে।
দ্বিতীয়ত, সচেতনতার অভাব এই শিশুদের আরেকটি সাধারণ ঘটনা। তারা ট্রাফিকের মৌলিক নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন, ট্রাফিক সাইন এর অর্থ এবং রাস্তা চিহ্নিতকরণ, সঠিক দক্ষতা ইত্যাদি না জেনে চালক হিসাবে বেড়ে উঠে।
তৃতীয়ত, তাদের দক্ষতা বিকাশের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। অনেক শিশু সাহায্যকারী ছাড়াও বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকে। যেমন পরিষ্কার করা, রক্ষণাবেক্ষণ, চাকা ঘোরানো, বিভিন্ন উপাদানের প্রধান সমন্বয় ইত্যাদি। এই ধরণের ক্রিয়াকলাপগুলি কেবল বিপজ্জনকই নয়, পরিচালনা করাও কঠিন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, তারা এই কাজগুলি করতে গিয়ে আহতও হয়।
সুপারভাইজার/কন্ডাক্টর ঃ কিশোর বয়সের ছেলেদের মধ্যে যাদের একটু পড়াশুনা অথাৎ নুন্যতম প্রাইমরি স্তর শেষ করে পরিবহনে আসে তাদের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায় কারণ তাদের নুন্যতম পড়াশুনা থাকায় তারা টাকার হিসেব করতে পারে। এখন কিছু শিক্ষিত ছেলে কন্ডাক্টর বা সুপারভাইজর হিসেবে গণপরিবহণে কাজ করছে তবেতাদের অধিকাংশই অন্য কোন চাকুরির ব্যাবস্থা করতে পারলে চলে যায়।
চালক ঃ আমাদের দেশে একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, ব্যাংকার বা যে কোন শ্রেণী পেশার জন্য দক্ষ জনবল তৈরী করতে সরকার জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা খরচ করে। অথচ দেশে একজন চালক তৈরী করতে সরকারের এক টাকাও খরচ করতে হয় না বা করে না। ফলেশ্রমিকদের প্রত্যেকেই কিশোর বয়সে প্রথমে টার্মিনালে ঘোরাঘুরি করতে করতে বাস বা ট্রাকের শ্রমিকদের চা-নাস্তা আনা থেকে শুরু করে বাস/ট্রাক ধোয়ামোছা করতে করতে আর ওস্তাদের (চালক) হুকুম শোনতে শোনতে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেন এবংএই কাজের মাধ্যমেইএকদিন পেশাদারি ড্রাইভার বা চালক হন। ফলে আমাদের দেশের চালকেরা কিভাবে গাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণ করে গন্তব্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যায় তার ব্যাবহারিক শিক্ষা আয়ত্ত করে দক্ষ হয়। তাদের জন্য কোন শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। বিআরটিএ,র ১২৬টি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আছে এগুলো প্রাইভেট কার চালকদের জন্য। একটাও বাস ও ট্রাক চালক ইনস্টিটিউট নেই। বিআরটিসির ২৩টি ট্রেনিং সেন্টার আছে এর মধ্যে ৯টি বন্ধ হয়ে আছে।
পরিবহণ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র ঃ আমাদের জাতীয় মহাসড়কের সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৮১২.৭৮ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ২৪৬.৯৭ কিলোমিটার, জেলা সড়কের দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ২৪২.৩৩ কিলোমিটার সর্বমোট দৈর্ঘ্য ২১ হাজার ৩০২.০৮ কিলোমিটার। পরিবহণ শ্রমিকদের কর্মস্থল দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত এই ২১ হাজার ৩০২.০৮ কিলোমিটার সড়ক। চট্টগ্রাম পোর্ট থেকে মাল নিয়ে একজন চালক যদি পঞ্চগড় যায়, তার সময় লাগে অনেক সময় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যে একজন শ্রমিক লাশ হয়ে ফিরবে, না পঙ্গু হয়ে ফিরবে এর কোন নিশ্চয়তা থাকে না। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করতে হলে একজন চালকের ৫/৬ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো উচিৎ নয়। সড়ক পরিবহণ এমন একটা সেক্টর যেখানে মহামান্য হাই কোর্টের এই নির্দেশনাও উপেক্ষিত হয়। বাস্তবতা হলো, একজন চালক ঢাকা শহরে সকালে গাড়ি নিয়ে বের হয় ফিরে রাত ২/৩ টায়। মালিকের সঙ্গে চুক্তিতে ড্রাইভিং সিটে বসতে হয়। ঐ চুক্তির টাকা তুলতে দিনে ১৫/২০ ঘণ্টার উপর গাড়ি চালাতে হয়। চলতি পথে তাদের প্রস্র্রাব-পায়খানার কোন ব্যবস্থা ঢাকা শহরে নাই। গাড়ি পার্কিং-এর কোন ব্যবস্থা নাই। হাইওয়ে চালকদের ও সহকারীদের জন্য এই দীর্ঘ সময়ে পথে কোন বিশ্রামের ব্যবস্থা নাই, বলা যায় গাড়িই কর্মস্থল, গাড়িই আবাসস্থল। অনেক সময় পরিবহণ শ্রমিকরা পথে ডাকাতির কবলে পড়ে প্রাণও হারায়। একই রাস্তায়, উচ্চগতির, মধ্যগতি, ধীরগতির গাড়ি, গরুর গাড়ি, ঠেলা গাড়ি, নসিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি চলে। আবার রাস্তার মানও খারাপ।
কর্মক্ষেত্রে চালকের চ্যালেজ্ঞসমূহ ঃ শ্রমিকরা পথে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে গাড়ি চালান তা নিম্নরুপ-
১. মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম
২. অতিরিক্ত কর্মঘন্টা
৩. ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা
৪. ত্রুটিপূর্ন যানবাহন
৫. সড়কের অব্যাস্থাপনা
৬. অধিক আয়ের তাগিদ (সিটি ও দূরপাল্লার লোকাল বাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রে)
৭. যাত্রি ও মালিকের দুর্ব্যবহার
৮. অস্বাস্থ্যকর খাদ্য ও পরিবেশ
৯. দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য
১০. কিশোর ও তরুণ চালকদের হিরোইজম মনভাব
১১. গণপরিবহনে যাত্রিদের দ্রুত গন্তব্যে পৌছানোর তাগিদ, শ্লেজিং ইত্যাদির মাধ্যমে চালককে বিরক্তকরন।
১২. পথে পথে পুলিশি হয়রানি ও চাঁদাবাজি
১৩. পথে পথে ভিবিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি
১৪. সড়ক আইনের অতিরিক্ত জরিমানা ও জামিন অযোগ্য ধারা
১৫. দুর্ঘটনায় আহত/নিহত হওয়া
১৬. পথচারির/সাধারণ সানুষের সহিংতায় আহত বা নিহত হওয়া
১৭. রাজনৈতিক সহিংতায় আক্রান্ত হয়ে আহত বা নিহত হওয়া।
কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যু ঃ বিলস্ এর গবেষনায় কর্মক্ষেত্রে গত আট বছরে দুর্ঘটনায় পরিবহণ শ্রমিক মৃত্যুর যে চিত্র (২০১৫-২০২২) আমরা দেখতে পাই, তা হলো- ২০১১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিবহণ সেক্টরে গত ১২ বছরে ৩৮১৯ জন শ্রমিক নিহত হন। ২০২২ সালে ৪৯৯ জন শ্রমিক নিহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০২১ সালে ৫১৩ জন, ২০২০ সালে ৩৪৮ জন, ২০১৯ সালে ৫১৬ জন, ২০১৮ সালে ৪২৪ জন, ২০১৭ সালে ২৪৯ জন পরিবহণ শ্রমিকমারাযান। শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে কাডির্য়াক এরেস্ট বা হার্ট এটাকে আক্রান্ত হয়েও প্রায়ই মারা যাচ্ছেন বা প্যারালাইসড হয়ে যাচ্ছেন সেই পরিসংখ্যান এবং কর্মক্ষেত্রে আহত হয়ে স্থায়ি পঙ্গু হয়ে যাওয় শ্রমিকদের সংখ্যা বিলস্ এর তথ্যে পাওয়া যায় নাই এবং কোথাও এই পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
এটা খুবই দুঃখজনক যে শুধুমাত্র প্রচার প্রবাকান্ডা ধরণের কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবহণ শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে নিজে মারা যাচ্ছেন আবার অন্যের মৃত্যুর জন্য দায়িও হয়ে যাচ্ছেন। নেতিবাচকভাবে বেপোরোয়াগতি ইত্যাদি প্রাধান্য দিয়ে সংবাদ প্রচার হওয়ায় মানুষের মধ্যে সড়ক পরিবহণ শ্রমিক সম্পর্কে একদিকে যেমননেতিবাচক ধারণা তৈরী হয়েছে অন্যদিকে মানুষও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে।
পরিবহণ শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ঃ পরিবহণ শ্রমিকদের কোন ধরনের নিয়োগপত্র, চুক্তিপত্র মালিকপক্ষকে এখন পর্যন্ত দিতে হয় না, শুধুমাত্র মৌখিক চুক্তিতে কাজে যোগ দেয়। শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, সার্ভিস বুক ইত্যাদি না থাকার কারণে চাকুরির নিরাপত্তা বলে কিছু নাই। দুই বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চালক যে বেতনে কাজ করেন ২০/২৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চালকও সেই একই বেতনে কাজ করেন। আবার শ্রমিকদের বয়স বাড়ার (৫০/৫৫ বছর) সাথে সাথে কাজ হারানোর ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। যে কারণে শ্রমিকদের মাঝে কোন শৃঙ্খলা নাই।
সড়কের অবস্থা ঃ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত এই মহাসড়ক নির্মাণের মাত্র এক বছরের মধ্যে ভঙ্গুর হয়ে যায়। আবার জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা। একই সমস্যা দেখা দেয় এ সড়কেও। অথচ দুই মহাসড়কই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বানিয়েছিল সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এত অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এমন অবস্থা দেখে খোদ সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বহুবার ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক নষ্ট হলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হয়। সড়ক নিয়ে গবেষণা, মানোন্নয়ন বা এগুলো রক্ষার জন্য দেশে একটি পুরোনো গবেষণাগার রয়েছে। পুরো নাম ‘বাংলাদেশ সড়ক গবেষণাগার-বিআরআরএল’। অবাক করার বিষয়, গবেষণার এ প্রতিষ্ঠানে কোনো গবেষক নেই। মূলত পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ হয় এখানে। গবেষণার জন্য যা বরাদ্দ হয়, পুরোটাই ব্যয় হয় নমুনা পরীক্ষা, ল্যাব পরিচালনাসহ যন্ত্রপাতি কেনায়। ল্যাব পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন পরীক্ষকরাই। সড়ক গবেষণাগারের মূল কাজ নির্মাণ শুরুর আগে একবার নির্মাণ উপকরণ বা পণ্যের মান যাচাই করা। এরপর চুক্তি অনুসারে মানসম্মত ও সঠিক পরিমাণে উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা। নতুন নতুন বিষয়ে গবেষণা করা। কিন্তু এর কিছুই হয় না এখানে। শুধু কাজ পাওয়ার পর ঠিকাদাররা নিজ দায়িত্ব নির্মাণ উপকরণের নমুনা পরীক্ষা করে নেন। অনেক সময় সক্ষমতা না থাকায় সওজের গবেষণাগারে সব পণ্যের পরীক্ষাও করা যায় না। বুয়েট কিংবা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গবেষণাগার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনা হয়। এমনকি অনেক বড় প্রকল্পের মালপত্র পরীক্ষা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ল্যাবে। আবার সড়ক নির্মাণের পর মান যাচাই করার সুযোগ থাকলেও সেটা হচ্ছে না। ফলে দ্রুত সড়ক বেহাল হয়ে পড়ে।
সড়ক গবেষণা খাতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও ব্যয় হয়েছে ৩২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও ব্যয় হয়েছে ২৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। সবশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও ব্যয় হয়েছে ৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
সড়কের মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রশিক্ষণ বিভাগে গবেষণা খাতে গত পাঁচ অর্থবছরে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫০ লাখ, ২০১৮-১৯ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোনো বরাদ্দ হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮৫ লাখ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬০ লাখ ৮২ হাজার ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৭ লাখ ৬১ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। পরামর্শক খাতে ২০২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দ হয় ২৫ লাখ টাকা। সড়ক ও জনপথের হিসাবে, মিরপুরসহ সারা দেশের ল্যাবরেটরির কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতার বাইরে গবেষণা বরাদ্দ সামান্য। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সাত বছরে গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০ কোটি টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজার ২৮১ কোটি টাকা সড়ক ও সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে। আর গত ১০ বছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে। অথচ ২০১৮ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক জরিপ অনুসারে, সড়কের খারাপ অবস্থার দিক থেকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। সড়কের গুণমান ও গড় গতিবেগ বিষয়ে ২০২২ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১৬২টি দেশের সড়ক নিয়ে তৈরি ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের সড়কে গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ৪১ কিলোমিটার।
প্রকৌশলীরা বলছেন, মূলত নতুন সড়ক ২০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকবে ধরে বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে মেরামতের দরকার পড়ে। এমনকি কিছু সড়ক দ্রুতই বেহাল হচ্ছে। এত বিনিয়োগের পরও দেশের সড়কের অবস্থা খারাপ। আর এর মূল কারণ নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, যথাযথ উপকরণ না দেওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ ব্যবস্থা। অথচ মানসম্মত উপকরণ নিশ্চিত করা এবং নির্মাণের পর তা যাচাই করার জন্য সওজের গবেষণাগার রয়েছে। গবেষণাগার আছে সড়ক নির্মাণের দায়িত্বে থাকা আরেক সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরেরও (এলজিইডি)। কিন্তু এসব গবেষণাগার নামেই আছে।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বলছে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের একটা বড় অংশের সড়কেই রয়েছে নানা ত্রুটি, যা গবেষণায় নিরসন সম্ভব হয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছর পিচের (পেভমেন্ট) মান যাচাইয়ের জন্য ‘পেভমেন্ট ফেইলিউর ইনভেস্টিগেশন’ শিরোনামে একটি জরিপ চালিয়েছিল সড়ক ও জনপথ(সওজ) বিভাগ। জরিপের নমুনায় ১৮টি সড়ক বেছে নেওয়া হয়েছিল। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সড়কের প্রায় প্রতিটিই আন্ডুলেশন (রাস্তায় মধ্যে ঢেউ) সমস্যার মধ্যে রয়েছে।সড়কের মানের ওপর ভিত্তি করে সেগুলোকে ভালো, চলনসই, দুর্বল, খারাপ ও খুব খারাপএ পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করে থাকে সড়ক ও জনপথ(সওজ) বিভাগ। এর মধ্যে কোনো সড়কে যদি আন্ডুলেশন থাকে, সেটি পড়ে ‘খারাপ’ সড়কের তালিকায়। কাজেই গবেষণাই বলে দিচ্ছে যে, আমাদের প্রতিটি রাস্তাই খারাপ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (সংক্ষেপে বিআরটিএ) মোটর যান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ (সংশোধনী-১৯৮৭) -এর অধ্যায় ২ দ্বারা গঠিত এবং ১৯৮৮ সাল থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিআরটিএ বাংলাদেশের সড়ক পরিবহণ খাত ও সড়ক নিরাপত্তা মধ্যে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিআরটিএ ও পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। বিআরটিএ মোটর যান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের [১] অধীনে কাজ করছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী হচ্ছেন চেয়ারম্যান, যিনি সংস্থার বিধি দ্বারা এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে থাকেন।[২]
কার্যক্রম ঃ
১) মোটরযান কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, পারমিট প্রদান, বাস ও ট্রাকের ভাড়া নির্ধারণ করে সড়ক পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ করা।
২) ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট ও প্রশিক্ষক লাইসেন্স প্রদানের মত নিয়মিত কর্ম।
৩) মোটরগাড়ি নিবন্ধীকরণ পরিক্ষা।
৪) নিরাপদ ড্রাইভিং এবং ট্রাফিক প্রবিধান সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের জন্য কর্মশালা সেমিনার আয়োজন এবং পরিচালনা।
৫) নিরাপদ সড়ক পরিবহণ এবং ট্রাফিক সিস্টেমের ধারণা এবং পদ্ধতি উন্নয়নের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন সাধন।
বিআরটিএ-এর চালকের গাড়ি চালানো অনুমতিপত্র বা লাইসেন্স, মোটরযানের গতিপ্রকৃতি ইত্যাদি তারা নিয়ন্ত্রণ করে। বাস্তবে বিআরটিএ একটা দুর্নীতিগ্রস্ত অসাধুদের সিন্ডিকেট চক্রের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ি সারাদেশে এখানে প্রতিদিন অনৈতিক কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়।
চালকের সনদ বা লাইসেন্স ঃ একটা লাইসেন্স নবায়ন করতে লার্নায় ফি বাবদ ৩২৫ টাকা, সরকারি ফি বাবদ ২৭২৫ টাকা এবং ডোপটেস্ট ফি বাবদ ৯০০ টাকা সর্বমোট ৩৯৫০ টাকা ফি ধার্য্য করা হয়েছে। অথচ একজন শ্রমিক নতুন লাইসেন্স করতে নিম্নতম ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং নবায়নে ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ করতে বাধ্য হয়। বিআরটিএ-তে যারা ইনিস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছেন,সনদ নিয়ে চালক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা স্কুল প্রতিষ্ঠিত করে ব্যবসা করছে, তারাই মূলত অধিক (নিম্নতম ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার) টাকার চুক্তিতে চালকের লাইসেন্স করে দেওয়ার কাজ করে দেয়। পুরো প্রক্রিয়াটাই বিআরটিএ-এর ইনিস্ট্রাক্টর, দালাল ও বিআরটিএ এর দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারি-কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সমাপ্ত হয়। প্রধানত শ্রমিকদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা এবং শ্রমিকদের মধ্যে প্রচলিত কথা দালালদের (ইনিস্ট্রক্টর-কর্মচারি-কর্মকর্তা) না ধরলে (ফিল্ড টেস্ট) পরীক্ষা পাশ করা যায় না, বাস্তবতাও তাই, এই কারণে শ্রমিকরা দালালদের স্বরনাপন্ন হতে বাধ্য হয়। শ্রমিকদের জন্য লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজলভ্য না হওয়ার কারণে তারা অনৈতিক উপায়ে লাইসেন্স সংগ্রহ ও ক্যাটাগরি পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। এর ফলে শ্রমিকদের দক্ষতা থাকলেও ট্রাফিকের মৌলিক নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন, ট্রাফিক সাইন এর অর্থ এবং রাস্তা চিহ্নিতকরণ ইত্যাদি না জেনেই চালক হন।
পরিবহণ শ্রমিকের মানসিক স্বাস্থ্য ঃ গণপরিবহণ যাত্রীদের সাথে পরিবহণ শ্রমিকদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় বা ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া বর্তমানে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। অপরিকল্পিত ও ভাঙা রাস্তাঘাট, ত্রুটিপূর্ন যানবাহন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনে অব্যবস্থাপনা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব, একই রাস্তায় উচ্চগতির যানবাহনের সাথে ধীরগতির যানবাহনের চলাচল, যাত্রীনেওয়ার প্রতিযোগিতা, উল্টোপথে যানবাহন চলাচল, যত্রতত্র পার্কিং, ইচ্ছামতো হেঁটে চলা, পথে পথে বিভিন্ন ধরনের চাঁদা দেয়ার চাপ ইত্যাদি নানারকম সমস্যায় জর্জরিত সড়কে চালকের বা চালকের সহকারি বা ভাড়া আদায়কারির কাজটি করেন তখন স্বাভাবিকভাবে তার মানসিক অবস্থা অত্যন্ত উত্তেজিত, উত্তপ্ত ও ক্ষিপ্ত থাকে। আর দিনের পর দিন এভাবে থাকতে থাকতে তাদের মানসিক দুরবস্থা স্থায়ী হয়ে যায়।
বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে ৩০ মিনিটের বেশি সময় পথে প্রতিদিন যেতে থাকলে একজন ব্যক্তির মনে বিষন্নতা উদ্বেগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। মনের প্রশান্তি ও সন্তষ্টি ক্রমশ নিম্নগামী হতে থাকে। মাত্র ৩০ মিনিটে বেশি সময়ের যাতয়াতে যদি এমন অবস্থা হয় তাহলে আমাদের দেশে নানাবিধ সমস্যাপূর্ন যোগাযোগ ব্যাবস্থায় এবং মানষিক চাপের প্রভাব মিলিয়ে পরিবহণ শ্রমিকের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।
পাওলো রুইগ্রুসোও তাঁর সহযোগীবৃন্দ ২০১৪ সালের পেরুর লিমাতে বাস ও রিকশা চালকদের উপর একটি গবেষণা করে দেখেন যে, ক্রমাগত শব্দদূষন, দীর্ঘমেয়াদী শ্রমচাপ, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ঘুমের অভাব ইত্যাদি কারণে বাস ও রিকশা চালকেরা মাদকসক্তি, সিজোফ্রেনিয়ার মত জটিল ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত হবার ঝুকিতে থাকে। যেহেতু বেশির ভাগ সময়ই চালকদের শ্রমঘন্টার বিপরীতে আয়ের পরিমাণ অনেক কম থাকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যথেষ্ট অর্থ উপার্জনের তাগিদ মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। তাই তারা বাড়তি সময় কাজ করে উপার্জনের পরিমান বাড়ানোর চাপ বোধ করে। এভাবে একজন ব্যক্তির মাঝে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে হতাশা, ভয়, দ্বদ্ধ ইত্যাদি যেমন তৈরি হয়; তেমনি তীব্র বিষন্নতা এবং দীর্ঘসময় কাজের ফলে বার্ন আউটের সমস্যাও তৈরি হয়। তাদের আচরণে খিটখিটে ভাব, অন্যের সাথে বদমেজাজ করা, অল্পে অতিরক্ত রাগ প্রকাশ ইত্যাদি লক্ষন পরিলক্ষিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সারাহ দিবা বলেন,পরিবহণ শ্রমিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে দীর্ঘসময় পথে থাকতে বাধ্য হন এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকেন। ফলে তাদের আবেগগুলো প্রক্রিয়াকরণের স্বাভাবিক সুযোগ আর পায় না। পরিবহণ শ্রমিকরা যেহেতু বেশি চাপ নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হন, ফলে মানসিক অস্থিররোধ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া তাদের ভেতরে আরও বেশি চাপ অনুভব করেন, ফলে মানুষিক অস্থিরবোধ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া তাদের ভিতর আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করে আর তারা এই অভ্যন্তরীণ দুর্বোধ্য খারাপ লাগা কমাতে মাদকদ্রব্য সেবন করে মনের অশান্ত অবস্থা প্রশমন করার পথ বেছে নেন। আর ধীরে ধীরে এই দ্রুত মানসিক প্রশান্তি পাবার এই পথ তাদেরকে মাদকাসক্তির শক্তিশালী শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলে।
পরিবহণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এ রকম অতিরিক্ত সময়ে কাজের চাপ, অনিয়মিত কাজের রুটিন, সীমিত বিশ্রামের সুযোগ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সহযোগিতার সম্পর্কগুলো হতে দীর্ঘসময় দূরে থাকার কারণে তাদের মনে স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। মানসিকভাবে এমন দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ন বা বিপন্ন অবস্থার একজন মানুষ যখন আবার যানবাহন চালানোর সময় দেখে যে, অন্যরা নিয়ম না মেনে তার গাড়ির পথ আটকে বা ওভারটেকিং করে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন হতাশা, ত্রেুাধ, ক্ষোভে সে বেপরোয়া ও মরিয়া হয়ে ওঠেন। যেসব দুর্ঘটনায় যান্ত্রিক ত্রুটি বা পরিবেশের প্রভাব কম যেখানে চালকের এরকম বেপরোয়া মানসিক অবস্থা দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
আমেরিকার লস এঞ্জেলসের বাস ও ট্রাক চালকদের নিয়ে করা গবেষণায় বিল্যান্ড ও ব্রেন্ট (২০১৭) দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘ যানজটে ও দীর্ঘসময়ের সিডিউলে যেসব চালকদের কাজ করতে হয় তাদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত উচ্চমাত্রার পারিবারিক সহিংসতার তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ এসব চালক শুধু তাৎক্ষণিক কোনো দুর্ঘটনা ঘটবার জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ তাই নয়; বরং তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের জন্যও ধীরে ধীরে হুমকীস্বরূপ হয়ে ওঠে।আমাদের দেশের পরিবহণ শ্রমিকদের জীবনে দীর্ঘসময়ের শ্রমের চাপ কখনো কখনো সেটা একটানা ৩০ থেকে ৪৮ ঘন্টা বা তারও বেশী, অনিয়মিত কাজের রুটিন, বিশ্রামের সুযোগ খুবই নাজেহাল, দীর্ঘসময় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনসমূহ থেকে বিচ্ছিন্নতা খুবই সাধারণ ঘটনা। এর ফলে সৃস্টি মানসিক অবস্থা শুধু রাস্তাঘাটের দুর্ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্তই নয়, তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকেও তীব্রভাবে প্রভাবিত করে।
পরিবহণ শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন ঃ দেশের মোট শ্রমজীবীদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমিক অর্থাৎ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। আর এই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতই হল সড়ক পরিবহণ। যে কোন প্রকৃতিক দূর্যোগ বা বিশেষ অবস্থায় সবাইকে যখন ঘরে থাকতে বলা হয়, তখনও পরিবহণ শ্রমিকরা কাজ করে। করোনা দুর্যোগে জরুরী পরিবহণ যেমন, খাদ্য, ঔষধ, কৃষি পণ্য, রপ্তানি দ্রব্য, এ্যাম্বুলেন্স সহ বহু ক্ষেত্রে পরিবহণ শ্র্রমকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ তাদেরকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করে নাই কিন্তু পরিবহণ শ্রমিকরা কাজ করেছে।
সকল শ্রমিকদের কাজ থাকলে তার সংসার, তার দৈনন্দিন খরচ চলে, না থাকলে চলে না। খুবই নিম্ন আয়ের কারণেতাদের কারোরই কোন সঞ্চয় নাই। যতদিন কর্মক্ষম দেহ সচল ততদিন আয় সচল। কোন কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে বা দুর্ঘটনায় পঙ্গু হলে, সরাসরি অপরের সাহায্য সহযোগিতা বা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন যাপন করা ছাড়া উপায় থাকে না। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসা করারও কেউ থাকে না। মালিকপক্ষ এককালিন সর্বোচ্চ ১০/১৫ বা ২০ হাজার টাকা দিয়ে সহযোগিতা করে, তারপর কেউ কোন খোঁজ রাখে না। আর সড়ক দুর্ঘটনার মামলা হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ সরাসরি দুর্ঘটনার দায় শ্রমিকের উপর চাপিয়ে দিয়ে মামলার খরচের কোন দায়িত্ব বহন করেন না। এক মামলাই তার জীবনকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু ও দুর্বিসহ করে তোলা। এই শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থা নেই, বৃদ্ধ বয়সে এদের জন্য পেনশন নেই, শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য কোন আইনও নাই।
সড়ক দুর্ঘটনা সর্ম্পকে মানুষের সাধারণ ধারণা ঃ কোন ছাত্র ফেল করা মানে তার শিক্ষক, সিলেবাস কারিকুলাম, এমন কি শিক্ষা ব্যাবস্থা ফেল করা এভাবে কেউ ভাবে না।সমাজের সর্বস্তরের মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে দুর্ঘটনার জন্য শুধুমাত্র চালকই দায়ি। সবাই বলে সড়কে যখন গাড়ি চলে তখন যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে চালকের হাতে কিন্তু কেউ চালকের নিরাপত্তার কথা ভাবে না। সেটা কেউ জানার প্রয়োজন বোধও করেন না। সব চালকই জানেন, যেকোন দূর্ঘটনায় আহত বা নিহত হওয়ার সম্ভাবনা সবার আগে থাকে তার বা তার সহকারির। সাধারণত যান্ত্রিক ত্রুটি, রাস্তার ত্রুটি, চালক বা পথচারির প্রতক্ষ্য কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। পরোক্ষ আরোও অনেক কারণও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ি।
গত ১৯ মার্চ,২০২৩ ঢাকা ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে-তে ইমাদ পরিবহনের বাস দুর্ঘটনায় চালক, কন্ডাক্টর হেলপারসহ ১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনিস্টিটিউট এর তদন্ত প্রতিবেদনে রাস্তার ত্রুটি, মানহীন চাকা এবং সড়কের অব্যাস্থাপনকে এই দুর্ঘটনা ও অতিরিক্ত প্রাণহানির জন্য দায়ি করেন। অথচ গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রতিবেদিত কারণ সমূহ নিন্মরুপ-
১. অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা
২. টায়ার ফেটে যাওয়া
৩. বাস চালকের ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা
৪. ব্রিজের রেলিং ভেঙ্গে নিচে পড়ে যাওয়া
৫. যান্তিক/ব্রেকের ক্রটি
৬. মধ্যম শ্রেণীর লাইসেন্স নিয়ে ড্রাইভিং
৭. পথচারীকে আঘাত
৮. আনফিট বাস
৯. ভেজা রাস্তা, ইত্যাদি
উল্লেখ করে সংবাদ পরিবেশন করে। এই দুর্ঘটনার জন্য অতিরিক্ত গতিকে ব্যাপকভাবে পুলিশ ও সংবাদ মাধ্যমে দায়ি করা হয়েছিলো কিন্তু বুয়েট তদন্ত এর সাথে দুর্ঘটনার কোনো সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পায়নি এবং স্পিড ট্রেকিং ডেটার উপর ভিত্তি করে বলছে, চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালায়নি। সামনের টায়ার ফেটে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেন। এবং প্রধানত অবকাঠামোগত ঘাটতি অনেক প্রাণহানির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গবেষণা বলছে চালক দুর্ঘটনার সময় ৭৯ কি.মি/ঘন্টা বেগে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন এবং মনোযোগী ছিলেন। তিনি ঘন্টায় ৯০ কি.মি/ঘন্টা এর চেয়ে কম গতিতে স্থিতিশীল গতি বজায় রেখে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। যৌক্তিকভাবে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক্সেস নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ের গতিসীমা ঘন্টায় ৮০ কি.মি এর অধিক হওয়া উচিৎ।
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের এক গ্রামে ছবির শুটিং স্পট দেখে ঢাকা ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ এবং শহিদ বুদ্ধিজীবী, নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর ছেলে এটিএন নিউজের প্রধান নিবার্হী মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। এ দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ ও শিল্পী ঢালী আল-মামুনসহ পাঁচজন আহতও হয়েছিলেন। সেই দুর্ঘটনার বুয়েট তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে “সোশ্যাল ক্রসফায়ার” নামে আমাদের পক্ষ থেকে একটি ডকুমেন্টরিও নিমার্ণ করা হয়েছে।
সেখানেও বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনিস্টিটিউট এর তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, “যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখানকার রাস্তার বাঁক ছিল অবৈজ্ঞানিক। রাস্তা নির্মাণ, সাইন-মাকিং-এ ত্রুটি ছিলো। সেখানে বেপরোয়া গতির কথা পত্রপত্রিকাসহ পুলিশ ও সরকারি তদন্ত কমিটির রির্পোটে উল্লেখ করেছে। অথচ জামিরের বাস বেপরোয়া গতিতে চলছিল বলা হলেও বাস্তবে এর গতি ছিল নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যেই। গবেষনা বলছে, চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স বাসের গতি ছিল ৩৫ কি.মি/ঘন্টা। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কেন হয়-তার একটি মাত্র উপসর্গের দিকেই আমরা সাধারণত নজর দিয়ে থাকি। সেটি হলো দুর্ঘটনার সব দায় কেবল গাড়ি চালকের।
সড়ক পরিবহণ আইন (২০১৮) ঃ ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই, ঢাকার বিমান বন্দর সড়কে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ফলে সরকার দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক দোষারোপের অবসান ঘটিয়ে ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮ প্রনয়ন এবং সড়ক পরিবহণের সাথে যুক্ত শ্রমিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে এই আইন কার্যকর করে। ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে কার্যকর সড়ক পরিবহণ আইন (২০১৮), ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ৪৭ নং আইন হিসেবে সংসদে সড়ক পরিবহণ আইন পাশ করার পর ৮ অক্টোবর ২০১৮ তা রাষ্ট্রপতির সম্মতিলাভ করে। ২০২২ সালের নভেম্বরে বিধি প্রণয়ন শেষে চুরান্ত কার্যকর করা হয়েছে। তরিঘরি করে করা সড়ক আইন ২০১৮-এ স্পষ্টতই দুর্ঘটনার সকল দায় শ্রমিকের উপর চাপিয়ে শাস্তি ও জরিমানার বিধান করা হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ৫৪টি সংজ্ঞা এবং ১২৬টি ধারাকে ১৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। চালকের মনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা দিয়ে শাস্তির বিধান হলে সতর্কতা বাড়ে অন্যথায় সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। তাতে ঝুঁকি বাড়ে। একটি গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ আইন আমরা চাই যা সড়কে শৃঙ্খলা ও যাত্রীর নিরাপত্তাই শুধু নয় শ্রমিকদেরও আইনি সুরক্ষা দেবে। যে আইনে বিআরটিএ সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, পুলিশি হয়রানি, মালিকদের বেআইনি কার্যকলাপ ও শ্রম আইন না মানা, পথচারী ও যাত্রীদের আইন না মানা এবং শ্রমিকদের দায়িত্ব পালন সব কিছুকেই বিবেচনার আওতায় আনা হবে।
অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে দুর্ঘটনায় ও সাজার ওপর। কিন্তু সমান গুরুত্ব দেয়া দরকার শৃঙ্খলার উপর, যাত্রীর নিরাপত্তা ও শ্রমিকের সুরক্ষার উপর। দুর্ঘটনারও একটা সংজ্ঞা থাকা দরকার। দুর্ঘটনার তো সাজা হতে পারে না। আইন মানে নিয়মের শাসন। যে নিয়ম মানুষের স্বচ্ছন্দ বিকাশ ও সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করে আর এর সামনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে। জনগণের সেবা সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যে আইন রচিত হয় তা হয় গণতান্ত্রিক। আর মুষ্টিমের স্বার্থে জনগণের স্বার্থ সেবাকে কম গুরুত্বে রেখে যে আইন হয় তা অগণতান্ত্রিক। সড়ক পরিবহণের সাথে চালক, মালিক, বিআরটি-এ কর্তৃপক্ষ-সরকার, যাত্রী, পথচারী-সাধারণ জনগণ, সড়কের ব্যবস্থাপনা-অবকাঠামো, চালক, প্রশিক্ষণ, চাকরির বিধি, দুর্ঘটনা তদন্তের প্রক্রিয়া, সড়ক নির্মাণ, ডিজাইন ও ব্যবহার, ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ আইন-আদালত ইত্যাদি অনেক কিছু যুক্ত আছে। সড়ক আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে আনা হলো না। শ্রম আইনের আওতায়সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষকে না আনলে আইন কার্যকারিতা সম্পন্ন হবে না। কি কি কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তা যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তি বিধান বা ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়ানোর পথ বের করা সম্ভব হবে।
দুর্ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং শাস্তির লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করা হলে তা দিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হয় না। অপরাধীরা যে কোন অপরাধ করতে হলে পরিকল্পনা মাফিক করে কিন্তু দুর্ঘটনার কি কোন পরিকল্পনা থাকে? তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শাস্তির বিধান করতে আইন যা করা হোল তাতে দুর্ঘটনাকে আসলে অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সে কারনেই দেখা যাচ্ছে যে, ১২৬ ধারা সম্বলিত সড়ক পরিবহণ আইনে ৫১ টি ধারা প্রবর্তন করা হয়েছে যেখানে শাস্তির বিধান আছে। একাদশ অধ্যায়ে আছে অপরাধ, বিচার ও দন্ড। এই অধ্যায়ে ৪১ টি ধারা আছে আর ত্রয়োদশ অধ্যায়ে অপরাধ, পুলিশের ক্ষমতা এখানে ধারা আছে ১০টি। অর্থাৎ ৫১ টি ধারা সরাসরি শাস্তি সম্পর্কিত। এর বাইরেও আরও কিছু ধারা আছে যা দিয়ে শাস্তি দেয়া যেতে পারে।
সড়কে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, সময়ের অপচয় প্রভৃতি বিষয় নিয়ে সকলেই উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকেন। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কমপক্ষে ৩ কোটি মানুষ প্রতিদিন যাতায়তের জন্য কোন না কোন যানবাহন ব্যবহার করেন। দেশের কৃষি, শিল্প, সেবা খাতের পণ্য, নির্মাণ সামগ্রী পরিবহণ প্রভৃতি কাজে ছোট, হালকা, মাঝারি, বড়, ভারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহৃত হয় প্রতিদিন। ফলে সড়কে নিরাপত্তা সকলেরই মনোযোগ ও বিবেচনার দাবী রাখে। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে দেখা যায় প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষের মৃত্যু এবং ৫০ জন মানুষ আহত হয়ে থাকেন সড়ক দুর্ঘটনায়। এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব কারনেই সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ নীতিমালা খুবই প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করণীয় ঃ
১. সর্বপ্রথম পরিবহণ শ্রমিকদের“শোভন কাজ” তথা ন্যায্য মজুরী, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সবার জন্য সামাজিক সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সামাজিক বন্ধন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হবার অধিকার এবং সবার জন্য সমান সুবিধা এবং আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের ভাবমূর্তির যে সংকট তা দূর করে সম্মানের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২. চালকদের কাছ থেকে ভালো সেবা আশা করলে তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নিশ্চিত করতে হবে। চালকরা যেখান থেকে যাত্রা শুরু করবে বা শেষ করবে সেখানে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. ষ্ট্রেস মেনেজমেন্ট এখন সড়ক শ্রমিকের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাস এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় শ্রমিকদেরষ্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের উপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৪. সড়কের যানবাহন, যানবাহনগুলোরগতি-প্রকৃতি, ফিটনেস (চলন সামর্থ্য), ফিটনেস প্রদানকারির এবং প্রতিষ্ঠানের যথার্থ দক্ষতা, চালকের লাইসেন্স, চালকের মানসম্মত ট্রেনিং, সড়ক ও যানবাহনের অনুপাত, পার্কিং বা পরিসর, পথচারীদের চলাচল গতিবিধি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় সিগনাল ও গণঅভ্যস্থতা শহরে-নগরে আর সড়ক-মহাসড়কে বহুমাত্রিক যাতায়ত ব্যবস্থা ইত্যাদি ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দুর করতে হবে।
৫. সড়কে পরিবহণ শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সড়ক আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে আনতে হবে। সড়ক আইন ২০১৮ সংশোধন করে সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৭. অধিকাংশ দুর্ঘটনার কারণই নীতমালার ব্যর্থতা, অতএব নীতিনির্ধকরা সর্বদা চেষ্টা করেন তা গোপন রাখার জন্য। কাজেই বিআরটিএ, পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথ এর সদস্যদের বাদ দিয়ে দক্ষ, স্বাধীন/স্বতন্ত্র এবং পেশাদারদের নিয়ে তদন্ত কমিটি পুনগঠিত করে রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তের প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। দুর্ঘটনার তদন্ত করে মুল কারণ বা "রুট কজ" খুঁজে বের করে তার প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
৯. যে কোন যানবাহন চালানোর জন্যই প্রয়োজন তাত্ত্বিক জ্ঞান, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিজ্ঞতা। আমাদের চালকদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কোন ঘাটতি নাই কিন্তু তাত্ত্বিক জ্ঞানের অভাব আছে। তাদের তত্ত্বগত জ্ঞানের শিক্ষা দিতে হবে। এক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনৈতিকতার সাথে যুক্ত লোক প্রশিক্ষক হলে তা কখনোই কাজে আসবে না।
১০. সড়কের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য সড়ক সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে একটা ব্যবস্থাপনার অধিনে ও যথোপযোগী প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে নিয়ে আসতে হবে। শ্রমিকদের পরিচয়পত্র, গাড়ির ফিটনেস, বৈধ কাগজপত্র পরিবহণ শ্রমিকদের নিশ্চিত করতে হবে।
১১. নিয়োগপত্রটা শুধু একটা কাগজ নয় এটার সাথে তার শৃঙ্খলা ও জীবনের নিশ্চয়তা জড়িয়ে আছে।শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দিয়ে শৃঙ্খলায় আনতে হবে। প্রতি ট্রিপে ইনসেন্টিভ এর ব্যাবস্থা করে রক্ষনাত্নক গাড়ি চালনায় অভ্যস্ত করতে হবে।
১২. দূরপাল্লার যাত্রায় বিকল্প চালক, ৫ ঘন্টার বেশী গাড়ি চালনা নয়, যাত্রাপথে বিশ্রামাগার, রাস্তা পারাপারের ব্যাবস্থা এবং প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন করতে হবে। চালকদের জন্য হাইওয়ের পাশে এবং টার্মিনালে মানসম্মত বিশ্রামাগার নির্মাণ করে বিশ্রামের ব্যাবস্থা করতে হবে।
১৩. কোনো হাইওয়ে ও এক্সপ্রেক্সওয়ে নির্মাণের পূর্বে ও পরে রোড সেইফটি অডিট করতে হবে এবং রোড সেইফটি মেনেজমেন্টের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
১৪. একটা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পর শুধুমাত্র চালকের উপর দায় চাপানোর প্রবনতা পুলিশ, সংবাদ মাধ্যম এবং তদন্ত কমিটির কর্তাব্যাক্তিদের মধ্যে বিদ্যমান। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্ঘটনার রির্পোটগুলি প্রচার করার সময় ড্রাইভার কেন্দ্রিক ধারণাগুলি বন্ধ করতে হবে। অনেক সময় এটা আরও বেশী প্রাণহানির কারণ হয়ে দাড়ায়।
১৫. বিআরটিএ ও পুলিশের দুর্ণীতি, হয়রানি বন্ধ করে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
১৬. পরিবহণ শ্রমিকদের লোভনীয় হেন্ডসাম বেতন, ইনসেন্টিভ ও ঝুঁকি ভাতা এর ব্যাবস্থা করতে হবে।
১৭. লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ করতে অন রোড টেস্টিং এর মাধ্যমে চালককে ক্যাটাগরি ভিত্তিক লাইসেন্স দিতে হবে।
১৮. সরকারি খরচে প্রত্যেক জেলায় চালকের ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। বিআরটিএ-এর তালিকাভুক্ত ইনিস্ট্রাক্টর বাদ দিয়ে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত ইনিস্ট্রাক্টর দিয়ে চালকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। চালকদের সামগ্রিক বিষয়ে শিক্ষিত করার জন্য রাষ্ট্রকে খরচ বহন করতে হবে। নিরাপদ সড়ক ও জীবন রক্ষার তাগিদেএটা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো ভর্তুকী হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে।
উপসংহার ঃ সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষন প্রদান, ভূল সংশোধনের উদ্যেগ এবং শাস্তি প্রদান এসব কিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই সড়কে শৃঙ্খলা অনেকটা নিশ্চিত করা সম্ভব। নিরাপদ সড়কের জন্য সমন্বিত একটি কার্যকর কৌশল প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সবার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে চালকেরা বলির পাঠা কিংবা সোশ্যাল ক্রসফায়ারে পড়তেই থাকবেন, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা কখনো হ্রাস পাবে না। আর ৫০ লাখ পরিবহণ শ্রমিককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাদের অপরাধী চিহ্নিত করে কখনোই তাদের শৃঙ্খলায় আনা যাবে না।
সম্পাদনা ঃ মো. সেলিম
পরিবহণ শ্রমিক ও প্রধান সমস্বয়ক
সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের দায় কতটুকু???
ভূমিকা ঃ পরিবহণ একটি মূল্যবান পেশা। কোন দেশের অর্থনীতির গতি প্রবাহ, সড়কপথে নিরাপদ ভ্রমণ, পণ্য পরিবহণ ও পরিবহণ শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন এক সুত্রে গাঁথা। পরিবহণ ব্যবস্থা অনেকটা শরীরের রক্ত প্রবাহের মত। রক্ত প্রবাহ বন্ধ হলে যেমন শরীরের কোন অঙ্গই সচল থাকতে পারে না তেমনি পরিবহণ ব্যবস্থা অচল হলে দেশের কৃষি শিল্প সেবা সব খাত অচল হয়ে যেতে বাধ্য। যদিও পরিবহণ খাত বলতে নৌ, রেল, সড়ক, বিমান সব খাতকেই বুঝায় কিন্তু বর্তমানে আমাদের আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু সড়ক পরিবহণ খাত। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ কোটি যাত্রী, খাদ্য (ধান, চাল, সব্জি, ফল, চিনি, তেল,চা, মাছ, গরু-ছাগল, মুরগি, ডিম ইত্যাদি) সহ জ্বালানী তেল, ভোজ্য তেল, রড, সিমেন্ট, বালি ইত্যাদি মিলে বার্ষিক ১০ কোটি টনের বেশি পণ্য পরিবহণ, ৪৩ লাখের বেশি যানবাহন আর ৭০ লাখের বেশি শ্রমিক নিয়ে বিশাল এই পরিবহণ জগত। হাজার হাজার কোটি টাকা যানবাহন কিনতে বিনিয়োগ, প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভাড়া বাবদ আয়, আর সরকারের বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের খাত এই পরিবহণ সেক্টর।
অশিক্ষিত/স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিক, শক্তিশালী মালিক, চাঁদাবাজি এবং নিরুপায় যাত্রী নিয়ে এই খাত সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। সড়কে দুর্ঘটনা আতংকিত করে তুলছে সবাইকে। কিন্তু সরকার, কতৃপক্ষ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী অপরাপর শ্রেণী পেশার মানুষ দুর্ঘটনার শাস্তি নিয়ে যতটা সরব, দুর্ঘটনার কারণ দূর করার প্রচেষ্টা ততটা দৃশ্যমান হয়ে উঠে না।
পরিবহণ শ্রমিক ঃ আমাদের অভিবাকগণ (এমন কি পরিবহণ শ্রমিকরাও) কেউই তাদের সন্তানদের বাস কিংম্বা ট্রাকের চালক হওযার জন্য উৎসাহিত করেন না। প্রতিটা মাতা-পিতা তাদের বাচ্চাদের সর্বোচ্চ পাইলট (বিমান চালক) বা ক্যাপ্টেইন (জাহাজ চালক) হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন কিন্তু বাস বা ট্রাকের চালক হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন না। কাজেই ৭০ লাখের বেশি পরিবহণ শ্রমিক এবং ১০ লাখের মত মোটর মেকানিকগণ প্রায় প্রত্যেকেই অভাবের তারনায় কাজের অন্য কোন পথ খুজে না পেয়ে এই ঝুকিপূর্ন পেশায় এসেছেন। যদিও এদের বড় একটা অংশ পরিবহণ শ্রমিকদেরই সন্তান বা আত্মিয়-স্বজন। তবে এখন পরিবহণ শ্রমিকরা তাদের সন্তানদের পড়াশুনা করানোর চেষ্টা করেন আর চালক বা পরিবহনে পারতঃপক্ষে কাজে আসতে নিরুৎসাহিত করেন।
শিশু শ্রমিক ঃ বাংলাদেশে নগরায়নে ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়ার কারণে, বিশেষ করে পরিবহণ খাতে শিশুশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ। ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুরা সব ধরণের যানবাহনে বিশেষ করে গণপরিবহণে যেমন বাস, মিনি-বাস, মিনি-ট্রাক, হিউম্যান হলার ইত্যাদিতে ব্যাপক হারে কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, এই ছোট বাচ্চারা দারিদ্র্যতা, পারিবারিক সংকট, পারিবারিক সহিংসতা, ঋণগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদিœ কারণে এই পেশায় যুক্ত হয়। দারিদ্রতা এই শিশু কিশোরদের পরিবহণ জগতে টেনে আনে। যে বয়সে স্কুল কলেজে গিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন-সাহিত্য পড়ার কথা সে বয়সে জীবনের পাঠশালায় পরিবহণ শ্রমিকরা শিখে কয়েকটা টাকার জন্য কি কঠিন ও অমানবিক পরিশ্রম করতে হয়। তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ছেড়ে এই সেক্টরে সাহায্যকারী, কন্ডাক্টর বা দারোয়ান হিসেবে যুক্ত হতে হয়। তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে যে, এই কাজের মাধ্যমেই তারা একদিন ড্রাইভার হবে এবং চাকরি পাবে। তারা তাদের চিন্তাকে টার্মিনালে সীমাবদ্ধ রাখে এবং অগোছালোভাবে বেড়ে ওঠে। এই শিশুরা তাদের সারাদিন বাস বা ট্রাকে চালকের সাথে কাটায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের টার্মিনালে বাসড়কে পার্ক করা গাড়িতে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। কখনও কখনও তারা ড্রাইভারকে তাদের গাড়ি চালাতে দেখাতে বলে এবং এক সময় তারা বাস বা ট্রাক পার্ক করার সুযোগ পায়। সাধারণত, বাংলাদেশ পরিবহণ শিল্পে চালক হওয়ার জন্য এটি একটি সাধারণ পদ্ধতি বা পাইপলাইন। যে কারণে, এই ব্যাবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা বিদ্যমান।
প্রথমত, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার যা এই টার্মিনাল ছেলেদের জন্য নিশ্চিত করা হয়নি। এই কারণে, তারা একটি ক্ষুদ্র ভবিষ্যতের সাথে বড় হয় এবং তাদের স্বপ্ন চালক হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এই প্রক্রিয়ায় তারা শুধুমাত্র গাড়িটাকে কিভাবে রাস্তায় মেনেজ করে করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে সেটা আয়ত্ব করে। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নাই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার/সমাজের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা নাই। সুস্থ বিনোদন নাই। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, বিশ্রাম ও সুষম খাদ্যেরও নুন্যতম ব্যাবস্থা নাই। পক্ষান্তরে এই পরিবহণ শ্রমিকরা প্রতিদিন সমাজের, যাত্রীর, মালিকের, এমনকি অনেক শ্রমিক নেতাদের তাচ্ছিল্য আর ঘৃণাকে সঙ্গী করেই কাজ করতে বাধ্য হয়। ফলে তাদের মধ্যে সমাজের অপরাপর অংশের মানুষের প্রতি এক ধরণের তীব্র চাপা ক্ষোভও বিরাজ করে।
দ্বিতীয়ত, সচেতনতার অভাব এই শিশুদের আরেকটি সাধারণ ঘটনা। তারা ট্রাফিকের মৌলিক নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন, ট্রাফিক সাইন এর অর্থ এবং রাস্তা চিহ্নিতকরণ, সঠিক দক্ষতা ইত্যাদি না জেনে চালক হিসাবে বেড়ে উঠে।
তৃতীয়ত, তাদের দক্ষতা বিকাশের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। অনেক শিশু সাহায্যকারী ছাড়াও বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকে। যেমন পরিষ্কার করা, রক্ষণাবেক্ষণ, চাকা ঘোরানো, বিভিন্ন উপাদানের প্রধান সমন্বয় ইত্যাদি। এই ধরণের ক্রিয়াকলাপগুলি কেবল বিপজ্জনকই নয়, পরিচালনা করাও কঠিন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, তারা এই কাজগুলি করতে গিয়ে আহতও হয়।
সুপারভাইজার/কন্ডাক্টর ঃ কিশোর বয়সের ছেলেদের মধ্যে যাদের একটু পড়াশুনা অথাৎ নুন্যতম প্রাইমরি স্তর শেষ করে পরিবহনে আসে তাদের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায় কারণ তাদের নুন্যতম পড়াশুনা থাকায় তারা টাকার হিসেব করতে পারে। এখন কিছু শিক্ষিত ছেলে কন্ডাক্টর বা সুপারভাইজর হিসেবে গণপরিবহণে কাজ করছে তবেতাদের অধিকাংশই অন্য কোন চাকুরির ব্যাবস্থা করতে পারলে চলে যায়।
চালক ঃ আমাদের দেশে একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, ব্যাংকার বা যে কোন শ্রেণী পেশার জন্য দক্ষ জনবল তৈরী করতে সরকার জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা খরচ করে। অথচ দেশে একজন চালক তৈরী করতে সরকারের এক টাকাও খরচ করতে হয় না বা করে না। ফলেশ্রমিকদের প্রত্যেকেই কিশোর বয়সে প্রথমে টার্মিনালে ঘোরাঘুরি করতে করতে বাস বা ট্রাকের শ্রমিকদের চা-নাস্তা আনা থেকে শুরু করে বাস/ট্রাক ধোয়ামোছা করতে করতে আর ওস্তাদের (চালক) হুকুম শোনতে শোনতে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেন এবংএই কাজের মাধ্যমেইএকদিন পেশাদারি ড্রাইভার বা চালক হন। ফলে আমাদের দেশের চালকেরা কিভাবে গাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণ করে গন্তব্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যায় তার ব্যাবহারিক শিক্ষা আয়ত্ত করে দক্ষ হয়। তাদের জন্য কোন শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। বিআরটিএ,র ১২৬টি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আছে এগুলো প্রাইভেট কার চালকদের জন্য। একটাও বাস ও ট্রাক চালক ইনস্টিটিউট নেই। বিআরটিসির ২৩টি ট্রেনিং সেন্টার আছে এর মধ্যে ৯টি বন্ধ হয়ে আছে।
পরিবহণ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র ঃ আমাদের জাতীয় মহাসড়কের সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৮১২.৭৮ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ২৪৬.৯৭ কিলোমিটার, জেলা সড়কের দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ২৪২.৩৩ কিলোমিটার সর্বমোট দৈর্ঘ্য ২১ হাজার ৩০২.০৮ কিলোমিটার। পরিবহণ শ্রমিকদের কর্মস্থল দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত এই ২১ হাজার ৩০২.০৮ কিলোমিটার সড়ক। চট্টগ্রাম পোর্ট থেকে মাল নিয়ে একজন চালক যদি পঞ্চগড় যায়, তার সময় লাগে অনেক সময় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যে একজন শ্রমিক লাশ হয়ে ফিরবে, না পঙ্গু হয়ে ফিরবে এর কোন নিশ্চয়তা থাকে না। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করতে হলে একজন চালকের ৫/৬ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো উচিৎ নয়। সড়ক পরিবহণ এমন একটা সেক্টর যেখানে মহামান্য হাই কোর্টের এই নির্দেশনাও উপেক্ষিত হয়। বাস্তবতা হলো, একজন চালক ঢাকা শহরে সকালে গাড়ি নিয়ে বের হয় ফিরে রাত ২/৩ টায়। মালিকের সঙ্গে চুক্তিতে ড্রাইভিং সিটে বসতে হয়। ঐ চুক্তির টাকা তুলতে দিনে ১৫/২০ ঘণ্টার উপর গাড়ি চালাতে হয়। চলতি পথে তাদের প্রস্র্রাব-পায়খানার কোন ব্যবস্থা ঢাকা শহরে নাই। গাড়ি পার্কিং-এর কোন ব্যবস্থা নাই। হাইওয়ে চালকদের ও সহকারীদের জন্য এই দীর্ঘ সময়ে পথে কোন বিশ্রামের ব্যবস্থা নাই, বলা যায় গাড়িই কর্মস্থল, গাড়িই আবাসস্থল। অনেক সময় পরিবহণ শ্রমিকরা পথে ডাকাতির কবলে পড়ে প্রাণও হারায়। একই রাস্তায়, উচ্চগতির, মধ্যগতি, ধীরগতির গাড়ি, গরুর গাড়ি, ঠেলা গাড়ি, নসিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি চলে। আবার রাস্তার মানও খারাপ।
কর্মক্ষেত্রে চালকের চ্যালেজ্ঞসমূহ ঃ শ্রমিকরা পথে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে গাড়ি চালান তা নিম্নরুপ-
১. মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম
২. অতিরিক্ত কর্মঘন্টা
৩. ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা
৪. ত্রুটিপূর্ন যানবাহন
৫. সড়কের অব্যাস্থাপনা
৬. অধিক আয়ের তাগিদ (সিটি ও দূরপাল্লার লোকাল বাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রে)
৭. যাত্রি ও মালিকের দুর্ব্যবহার
৮. অস্বাস্থ্যকর খাদ্য ও পরিবেশ
৯. দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য
১০. কিশোর ও তরুণ চালকদের হিরোইজম মনভাব
১১. গণপরিবহনে যাত্রিদের দ্রুত গন্তব্যে পৌছানোর তাগিদ, শ্লেজিং ইত্যাদির মাধ্যমে চালককে বিরক্তকরন।
১২. পথে পথে পুলিশি হয়রানি ও চাঁদাবাজি
১৩. পথে পথে ভিবিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি
১৪. সড়ক আইনের অতিরিক্ত জরিমানা ও জামিন অযোগ্য ধারা
১৫. দুর্ঘটনায় আহত/নিহত হওয়া
১৬. পথচারির/সাধারণ সানুষের সহিংতায় আহত বা নিহত হওয়া
১৭. রাজনৈতিক সহিংতায় আক্রান্ত হয়ে আহত বা নিহত হওয়া।
কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যু ঃ বিলস্ এর গবেষনায় কর্মক্ষেত্রে গত আট বছরে দুর্ঘটনায় পরিবহণ শ্রমিক মৃত্যুর যে চিত্র (২০১৫-২০২২) আমরা দেখতে পাই, তা হলো- ২০১১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিবহণ সেক্টরে গত ১২ বছরে ৩৮১৯ জন শ্রমিক নিহত হন। ২০২২ সালে ৪৯৯ জন শ্রমিক নিহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০২১ সালে ৫১৩ জন, ২০২০ সালে ৩৪৮ জন, ২০১৯ সালে ৫১৬ জন, ২০১৮ সালে ৪২৪ জন, ২০১৭ সালে ২৪৯ জন পরিবহণ শ্রমিকমারাযান। শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে কাডির্য়াক এরেস্ট বা হার্ট এটাকে আক্রান্ত হয়েও প্রায়ই মারা যাচ্ছেন বা প্যারালাইসড হয়ে যাচ্ছেন সেই পরিসংখ্যান এবং কর্মক্ষেত্রে আহত হয়ে স্থায়ি পঙ্গু হয়ে যাওয় শ্রমিকদের সংখ্যা বিলস্ এর তথ্যে পাওয়া যায় নাই এবং কোথাও এই পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
এটা খুবই দুঃখজনক যে শুধুমাত্র প্রচার প্রবাকান্ডা ধরণের কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবহণ শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে নিজে মারা যাচ্ছেন আবার অন্যের মৃত্যুর জন্য দায়িও হয়ে যাচ্ছেন। নেতিবাচকভাবে বেপোরোয়াগতি ইত্যাদি প্রাধান্য দিয়ে সংবাদ প্রচার হওয়ায় মানুষের মধ্যে সড়ক পরিবহণ শ্রমিক সম্পর্কে একদিকে যেমননেতিবাচক ধারণা তৈরী হয়েছে অন্যদিকে মানুষও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে।
পরিবহণ শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ঃ পরিবহণ শ্রমিকদের কোন ধরনের নিয়োগপত্র, চুক্তিপত্র মালিকপক্ষকে এখন পর্যন্ত দিতে হয় না, শুধুমাত্র মৌখিক চুক্তিতে কাজে যোগ দেয়। শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, সার্ভিস বুক ইত্যাদি না থাকার কারণে চাকুরির নিরাপত্তা বলে কিছু নাই। দুই বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চালক যে বেতনে কাজ করেন ২০/২৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চালকও সেই একই বেতনে কাজ করেন। আবার শ্রমিকদের বয়স বাড়ার (৫০/৫৫ বছর) সাথে সাথে কাজ হারানোর ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। যে কারণে শ্রমিকদের মাঝে কোন শৃঙ্খলা নাই।
সড়কের অবস্থা ঃ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত এই মহাসড়ক নির্মাণের মাত্র এক বছরের মধ্যে ভঙ্গুর হয়ে যায়। আবার জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা। একই সমস্যা দেখা দেয় এ সড়কেও। অথচ দুই মহাসড়কই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বানিয়েছিল সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এত অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এমন অবস্থা দেখে খোদ সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বহুবার ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক নষ্ট হলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হয়। সড়ক নিয়ে গবেষণা, মানোন্নয়ন বা এগুলো রক্ষার জন্য দেশে একটি পুরোনো গবেষণাগার রয়েছে। পুরো নাম ‘বাংলাদেশ সড়ক গবেষণাগার-বিআরআরএল’। অবাক করার বিষয়, গবেষণার এ প্রতিষ্ঠানে কোনো গবেষক নেই। মূলত পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ হয় এখানে। গবেষণার জন্য যা বরাদ্দ হয়, পুরোটাই ব্যয় হয় নমুনা পরীক্ষা, ল্যাব পরিচালনাসহ যন্ত্রপাতি কেনায়। ল্যাব পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন পরীক্ষকরাই। সড়ক গবেষণাগারের মূল কাজ নির্মাণ শুরুর আগে একবার নির্মাণ উপকরণ বা পণ্যের মান যাচাই করা। এরপর চুক্তি অনুসারে মানসম্মত ও সঠিক পরিমাণে উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা। নতুন নতুন বিষয়ে গবেষণা করা। কিন্তু এর কিছুই হয় না এখানে। শুধু কাজ পাওয়ার পর ঠিকাদাররা নিজ দায়িত্ব নির্মাণ উপকরণের নমুনা পরীক্ষা করে নেন। অনেক সময় সক্ষমতা না থাকায় সওজের গবেষণাগারে সব পণ্যের পরীক্ষাও করা যায় না। বুয়েট কিংবা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গবেষণাগার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনা হয়। এমনকি অনেক বড় প্রকল্পের মালপত্র পরীক্ষা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ল্যাবে। আবার সড়ক নির্মাণের পর মান যাচাই করার সুযোগ থাকলেও সেটা হচ্ছে না। ফলে দ্রুত সড়ক বেহাল হয়ে পড়ে।
সড়ক গবেষণা খাতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও ব্যয় হয়েছে ৩২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও ব্যয় হয়েছে ২৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। সবশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও ব্যয় হয়েছে ৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
সড়কের মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রশিক্ষণ বিভাগে গবেষণা খাতে গত পাঁচ অর্থবছরে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫০ লাখ, ২০১৮-১৯ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোনো বরাদ্দ হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮৫ লাখ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬০ লাখ ৮২ হাজার ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৭ লাখ ৬১ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। পরামর্শক খাতে ২০২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দ হয় ২৫ লাখ টাকা। সড়ক ও জনপথের হিসাবে, মিরপুরসহ সারা দেশের ল্যাবরেটরির কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতার বাইরে গবেষণা বরাদ্দ সামান্য। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সাত বছরে গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০ কোটি টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজার ২৮১ কোটি টাকা সড়ক ও সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে। আর গত ১০ বছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে। অথচ ২০১৮ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক জরিপ অনুসারে, সড়কের খারাপ অবস্থার দিক থেকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। সড়কের গুণমান ও গড় গতিবেগ বিষয়ে ২০২২ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১৬২টি দেশের সড়ক নিয়ে তৈরি ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের সড়কে গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ৪১ কিলোমিটার।
প্রকৌশলীরা বলছেন, মূলত নতুন সড়ক ২০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকবে ধরে বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে মেরামতের দরকার পড়ে। এমনকি কিছু সড়ক দ্রুতই বেহাল হচ্ছে। এত বিনিয়োগের পরও দেশের সড়কের অবস্থা খারাপ। আর এর মূল কারণ নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, যথাযথ উপকরণ না দেওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ ব্যবস্থা। অথচ মানসম্মত উপকরণ নিশ্চিত করা এবং নির্মাণের পর তা যাচাই করার জন্য সওজের গবেষণাগার রয়েছে। গবেষণাগার আছে সড়ক নির্মাণের দায়িত্বে থাকা আরেক সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরেরও (এলজিইডি)। কিন্তু এসব গবেষণাগার নামেই আছে।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বলছে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের একটা বড় অংশের সড়কেই রয়েছে নানা ত্রুটি, যা গবেষণায় নিরসন সম্ভব হয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছর পিচের (পেভমেন্ট) মান যাচাইয়ের জন্য ‘পেভমেন্ট ফেইলিউর ইনভেস্টিগেশন’ শিরোনামে একটি জরিপ চালিয়েছিল সড়ক ও জনপথ(সওজ) বিভাগ। জরিপের নমুনায় ১৮টি সড়ক বেছে নেওয়া হয়েছিল। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সড়কের প্রায় প্রতিটিই আন্ডুলেশন (রাস্তায় মধ্যে ঢেউ) সমস্যার মধ্যে রয়েছে।সড়কের মানের ওপর ভিত্তি করে সেগুলোকে ভালো, চলনসই, দুর্বল, খারাপ ও খুব খারাপএ পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করে থাকে সড়ক ও জনপথ(সওজ) বিভাগ। এর মধ্যে কোনো সড়কে যদি আন্ডুলেশন থাকে, সেটি পড়ে ‘খারাপ’ সড়কের তালিকায়। কাজেই গবেষণাই বলে দিচ্ছে যে, আমাদের প্রতিটি রাস্তাই খারাপ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (সংক্ষেপে বিআরটিএ) মোটর যান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ (সংশোধনী-১৯৮৭) -এর অধ্যায় ২ দ্বারা গঠিত এবং ১৯৮৮ সাল থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিআরটিএ বাংলাদেশের সড়ক পরিবহণ খাত ও সড়ক নিরাপত্তা মধ্যে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিআরটিএ ও পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। বিআরটিএ মোটর যান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের [১] অধীনে কাজ করছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী হচ্ছেন চেয়ারম্যান, যিনি সংস্থার বিধি দ্বারা এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে থাকেন।[২]
কার্যক্রম ঃ
১) মোটরযান কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, পারমিট প্রদান, বাস ও ট্রাকের ভাড়া নির্ধারণ করে সড়ক পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ করা।
২) ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট ও প্রশিক্ষক লাইসেন্স প্রদানের মত নিয়মিত কর্ম।
৩) মোটরগাড়ি নিবন্ধীকরণ পরিক্ষা।
৪) নিরাপদ ড্রাইভিং এবং ট্রাফিক প্রবিধান সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের জন্য কর্মশালা সেমিনার আয়োজন এবং পরিচালনা।
৫) নিরাপদ সড়ক পরিবহণ এবং ট্রাফিক সিস্টেমের ধারণা এবং পদ্ধতি উন্নয়নের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন সাধন।
বিআরটিএ-এর চালকের গাড়ি চালানো অনুমতিপত্র বা লাইসেন্স, মোটরযানের গতিপ্রকৃতি ইত্যাদি তারা নিয়ন্ত্রণ করে। বাস্তবে বিআরটিএ একটা দুর্নীতিগ্রস্ত অসাধুদের সিন্ডিকেট চক্রের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ি সারাদেশে এখানে প্রতিদিন অনৈতিক কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়।
চালকের সনদ বা লাইসেন্স ঃ একটা লাইসেন্স নবায়ন করতে লার্নায় ফি বাবদ ৩২৫ টাকা, সরকারি ফি বাবদ ২৭২৫ টাকা এবং ডোপটেস্ট ফি বাবদ ৯০০ টাকা সর্বমোট ৩৯৫০ টাকা ফি ধার্য্য করা হয়েছে। অথচ একজন শ্রমিক নতুন লাইসেন্স করতে নিম্নতম ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং নবায়নে ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ করতে বাধ্য হয়। বিআরটিএ-তে যারা ইনিস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছেন,সনদ নিয়ে চালক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা স্কুল প্রতিষ্ঠিত করে ব্যবসা করছে, তারাই মূলত অধিক (নিম্নতম ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার) টাকার চুক্তিতে চালকের লাইসেন্স করে দেওয়ার কাজ করে দেয়। পুরো প্রক্রিয়াটাই বিআরটিএ-এর ইনিস্ট্রাক্টর, দালাল ও বিআরটিএ এর দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারি-কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সমাপ্ত হয়। প্রধানত শ্রমিকদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা এবং শ্রমিকদের মধ্যে প্রচলিত কথা দালালদের (ইনিস্ট্রক্টর-কর্মচারি-কর্মকর্তা) না ধরলে (ফিল্ড টেস্ট) পরীক্ষা পাশ করা যায় না, বাস্তবতাও তাই, এই কারণে শ্রমিকরা দালালদের স্বরনাপন্ন হতে বাধ্য হয়। শ্রমিকদের জন্য লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজলভ্য না হওয়ার কারণে তারা অনৈতিক উপায়ে লাইসেন্স সংগ্রহ ও ক্যাটাগরি পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। এর ফলে শ্রমিকদের দক্ষতা থাকলেও ট্রাফিকের মৌলিক নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন, ট্রাফিক সাইন এর অর্থ এবং রাস্তা চিহ্নিতকরণ ইত্যাদি না জেনেই চালক হন।
পরিবহণ শ্রমিকের মানসিক স্বাস্থ্য ঃ গণপরিবহণ যাত্রীদের সাথে পরিবহণ শ্রমিকদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় বা ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া বর্তমানে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। অপরিকল্পিত ও ভাঙা রাস্তাঘাট, ত্রুটিপূর্ন যানবাহন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনে অব্যবস্থাপনা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব, একই রাস্তায় উচ্চগতির যানবাহনের সাথে ধীরগতির যানবাহনের চলাচল, যাত্রীনেওয়ার প্রতিযোগিতা, উল্টোপথে যানবাহন চলাচল, যত্রতত্র পার্কিং, ইচ্ছামতো হেঁটে চলা, পথে পথে বিভিন্ন ধরনের চাঁদা দেয়ার চাপ ইত্যাদি নানারকম সমস্যায় জর্জরিত সড়কে চালকের বা চালকের সহকারি বা ভাড়া আদায়কারির কাজটি করেন তখন স্বাভাবিকভাবে তার মানসিক অবস্থা অত্যন্ত উত্তেজিত, উত্তপ্ত ও ক্ষিপ্ত থাকে। আর দিনের পর দিন এভাবে থাকতে থাকতে তাদের মানসিক দুরবস্থা স্থায়ী হয়ে যায়।
বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে ৩০ মিনিটের বেশি সময় পথে প্রতিদিন যেতে থাকলে একজন ব্যক্তির মনে বিষন্নতা উদ্বেগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। মনের প্রশান্তি ও সন্তষ্টি ক্রমশ নিম্নগামী হতে থাকে। মাত্র ৩০ মিনিটে বেশি সময়ের যাতয়াতে যদি এমন অবস্থা হয় তাহলে আমাদের দেশে নানাবিধ সমস্যাপূর্ন যোগাযোগ ব্যাবস্থায় এবং মানষিক চাপের প্রভাব মিলিয়ে পরিবহণ শ্রমিকের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।
পাওলো রুইগ্রুসোও তাঁর সহযোগীবৃন্দ ২০১৪ সালের পেরুর লিমাতে বাস ও রিকশা চালকদের উপর একটি গবেষণা করে দেখেন যে, ক্রমাগত শব্দদূষন, দীর্ঘমেয়াদী শ্রমচাপ, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ঘুমের অভাব ইত্যাদি কারণে বাস ও রিকশা চালকেরা মাদকসক্তি, সিজোফ্রেনিয়ার মত জটিল ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত হবার ঝুকিতে থাকে। যেহেতু বেশির ভাগ সময়ই চালকদের শ্রমঘন্টার বিপরীতে আয়ের পরিমাণ অনেক কম থাকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যথেষ্ট অর্থ উপার্জনের তাগিদ মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। তাই তারা বাড়তি সময় কাজ করে উপার্জনের পরিমান বাড়ানোর চাপ বোধ করে। এভাবে একজন ব্যক্তির মাঝে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে হতাশা, ভয়, দ্বদ্ধ ইত্যাদি যেমন তৈরি হয়; তেমনি তীব্র বিষন্নতা এবং দীর্ঘসময় কাজের ফলে বার্ন আউটের সমস্যাও তৈরি হয়। তাদের আচরণে খিটখিটে ভাব, অন্যের সাথে বদমেজাজ করা, অল্পে অতিরক্ত রাগ প্রকাশ ইত্যাদি লক্ষন পরিলক্ষিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সারাহ দিবা বলেন,পরিবহণ শ্রমিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে দীর্ঘসময় পথে থাকতে বাধ্য হন এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকেন। ফলে তাদের আবেগগুলো প্রক্রিয়াকরণের স্বাভাবিক সুযোগ আর পায় না। পরিবহণ শ্রমিকরা যেহেতু বেশি চাপ নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হন, ফলে মানসিক অস্থিররোধ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া তাদের ভেতরে আরও বেশি চাপ অনুভব করেন, ফলে মানুষিক অস্থিরবোধ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া তাদের ভিতর আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করে আর তারা এই অভ্যন্তরীণ দুর্বোধ্য খারাপ লাগা কমাতে মাদকদ্রব্য সেবন করে মনের অশান্ত অবস্থা প্রশমন করার পথ বেছে নেন। আর ধীরে ধীরে এই দ্রুত মানসিক প্রশান্তি পাবার এই পথ তাদেরকে মাদকাসক্তির শক্তিশালী শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলে।
পরিবহণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এ রকম অতিরিক্ত সময়ে কাজের চাপ, অনিয়মিত কাজের রুটিন, সীমিত বিশ্রামের সুযোগ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সহযোগিতার সম্পর্কগুলো হতে দীর্ঘসময় দূরে থাকার কারণে তাদের মনে স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। মানসিকভাবে এমন দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ন বা বিপন্ন অবস্থার একজন মানুষ যখন আবার যানবাহন চালানোর সময় দেখে যে, অন্যরা নিয়ম না মেনে তার গাড়ির পথ আটকে বা ওভারটেকিং করে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন হতাশা, ত্রেুাধ, ক্ষোভে সে বেপরোয়া ও মরিয়া হয়ে ওঠেন। যেসব দুর্ঘটনায় যান্ত্রিক ত্রুটি বা পরিবেশের প্রভাব কম যেখানে চালকের এরকম বেপরোয়া মানসিক অবস্থা দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
আমেরিকার লস এঞ্জেলসের বাস ও ট্রাক চালকদের নিয়ে করা গবেষণায় বিল্যান্ড ও ব্রেন্ট (২০১৭) দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘ যানজটে ও দীর্ঘসময়ের সিডিউলে যেসব চালকদের কাজ করতে হয় তাদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত উচ্চমাত্রার পারিবারিক সহিংসতার তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ এসব চালক শুধু তাৎক্ষণিক কোনো দুর্ঘটনা ঘটবার জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ তাই নয়; বরং তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের জন্যও ধীরে ধীরে হুমকীস্বরূপ হয়ে ওঠে।আমাদের দেশের পরিবহণ শ্রমিকদের জীবনে দীর্ঘসময়ের শ্রমের চাপ কখনো কখনো সেটা একটানা ৩০ থেকে ৪৮ ঘন্টা বা তারও বেশী, অনিয়মিত কাজের রুটিন, বিশ্রামের সুযোগ খুবই নাজেহাল, দীর্ঘসময় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনসমূহ থেকে বিচ্ছিন্নতা খুবই সাধারণ ঘটনা। এর ফলে সৃস্টি মানসিক অবস্থা শুধু রাস্তাঘাটের দুর্ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্তই নয়, তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকেও তীব্রভাবে প্রভাবিত করে।
পরিবহণ শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন ঃ দেশের মোট শ্রমজীবীদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমিক অর্থাৎ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। আর এই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতই হল সড়ক পরিবহণ। যে কোন প্রকৃতিক দূর্যোগ বা বিশেষ অবস্থায় সবাইকে যখন ঘরে থাকতে বলা হয়, তখনও পরিবহণ শ্রমিকরা কাজ করে। করোনা দুর্যোগে জরুরী পরিবহণ যেমন, খাদ্য, ঔষধ, কৃষি পণ্য, রপ্তানি দ্রব্য, এ্যাম্বুলেন্স সহ বহু ক্ষেত্রে পরিবহণ শ্র্রমকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ তাদেরকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করে নাই কিন্তু পরিবহণ শ্রমিকরা কাজ করেছে।
সকল শ্রমিকদের কাজ থাকলে তার সংসার, তার দৈনন্দিন খরচ চলে, না থাকলে চলে না। খুবই নিম্ন আয়ের কারণেতাদের কারোরই কোন সঞ্চয় নাই। যতদিন কর্মক্ষম দেহ সচল ততদিন আয় সচল। কোন কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে বা দুর্ঘটনায় পঙ্গু হলে, সরাসরি অপরের সাহায্য সহযোগিতা বা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন যাপন করা ছাড়া উপায় থাকে না। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসা করারও কেউ থাকে না। মালিকপক্ষ এককালিন সর্বোচ্চ ১০/১৫ বা ২০ হাজার টাকা দিয়ে সহযোগিতা করে, তারপর কেউ কোন খোঁজ রাখে না। আর সড়ক দুর্ঘটনার মামলা হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ সরাসরি দুর্ঘটনার দায় শ্রমিকের উপর চাপিয়ে দিয়ে মামলার খরচের কোন দায়িত্ব বহন করেন না। এক মামলাই তার জীবনকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু ও দুর্বিসহ করে তোলা। এই শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থা নেই, বৃদ্ধ বয়সে এদের জন্য পেনশন নেই, শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য কোন আইনও নাই।
সড়ক দুর্ঘটনা সর্ম্পকে মানুষের সাধারণ ধারণা ঃ কোন ছাত্র ফেল করা মানে তার শিক্ষক, সিলেবাস কারিকুলাম, এমন কি শিক্ষা ব্যাবস্থা ফেল করা এভাবে কেউ ভাবে না।সমাজের সর্বস্তরের মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে দুর্ঘটনার জন্য শুধুমাত্র চালকই দায়ি। সবাই বলে সড়কে যখন গাড়ি চলে তখন যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে চালকের হাতে কিন্তু কেউ চালকের নিরাপত্তার কথা ভাবে না। সেটা কেউ জানার প্রয়োজন বোধও করেন না। সব চালকই জানেন, যেকোন দূর্ঘটনায় আহত বা নিহত হওয়ার সম্ভাবনা সবার আগে থাকে তার বা তার সহকারির। সাধারণত যান্ত্রিক ত্রুটি, রাস্তার ত্রুটি, চালক বা পথচারির প্রতক্ষ্য কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। পরোক্ষ আরোও অনেক কারণও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ি।
গত ১৯ মার্চ,২০২৩ ঢাকা ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে-তে ইমাদ পরিবহনের বাস দুর্ঘটনায় চালক, কন্ডাক্টর হেলপারসহ ১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনিস্টিটিউট এর তদন্ত প্রতিবেদনে রাস্তার ত্রুটি, মানহীন চাকা এবং সড়কের অব্যাস্থাপনকে এই দুর্ঘটনা ও অতিরিক্ত প্রাণহানির জন্য দায়ি করেন। অথচ গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রতিবেদিত কারণ সমূহ নিন্মরুপ-
১. অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা
২. টায়ার ফেটে যাওয়া
৩. বাস চালকের ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা
৪. ব্রিজের রেলিং ভেঙ্গে নিচে পড়ে যাওয়া
৫. যান্তিক/ব্রেকের ক্রটি
৬. মধ্যম শ্রেণীর লাইসেন্স নিয়ে ড্রাইভিং
৭. পথচারীকে আঘাত
৮. আনফিট বাস
৯. ভেজা রাস্তা, ইত্যাদি
উল্লেখ করে সংবাদ পরিবেশন করে। এই দুর্ঘটনার জন্য অতিরিক্ত গতিকে ব্যাপকভাবে পুলিশ ও সংবাদ মাধ্যমে দায়ি করা হয়েছিলো কিন্তু বুয়েট তদন্ত এর সাথে দুর্ঘটনার কোনো সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পায়নি এবং স্পিড ট্রেকিং ডেটার উপর ভিত্তি করে বলছে, চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালায়নি। সামনের টায়ার ফেটে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেন। এবং প্রধানত অবকাঠামোগত ঘাটতি অনেক প্রাণহানির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গবেষণা বলছে চালক দুর্ঘটনার সময় ৭৯ কি.মি/ঘন্টা বেগে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন এবং মনোযোগী ছিলেন। তিনি ঘন্টায় ৯০ কি.মি/ঘন্টা এর চেয়ে কম গতিতে স্থিতিশীল গতি বজায় রেখে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। যৌক্তিকভাবে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক্সেস নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ের গতিসীমা ঘন্টায় ৮০ কি.মি এর অধিক হওয়া উচিৎ।
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের এক গ্রামে ছবির শুটিং স্পট দেখে ঢাকা ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ এবং শহিদ বুদ্ধিজীবী, নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর ছেলে এটিএন নিউজের প্রধান নিবার্হী মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। এ দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ ও শিল্পী ঢালী আল-মামুনসহ পাঁচজন আহতও হয়েছিলেন। সেই দুর্ঘটনার বুয়েট তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে “সোশ্যাল ক্রসফায়ার” নামে আমাদের পক্ষ থেকে একটি ডকুমেন্টরিও নিমার্ণ করা হয়েছে।
সেখানেও বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনিস্টিটিউট এর তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, “যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখানকার রাস্তার বাঁক ছিল অবৈজ্ঞানিক। রাস্তা নির্মাণ, সাইন-মাকিং-এ ত্রুটি ছিলো। সেখানে বেপরোয়া গতির কথা পত্রপত্রিকাসহ পুলিশ ও সরকারি তদন্ত কমিটির রির্পোটে উল্লেখ করেছে। অথচ জামিরের বাস বেপরোয়া গতিতে চলছিল বলা হলেও বাস্তবে এর গতি ছিল নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যেই। গবেষনা বলছে, চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স বাসের গতি ছিল ৩৫ কি.মি/ঘন্টা। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কেন হয়-তার একটি মাত্র উপসর্গের দিকেই আমরা সাধারণত নজর দিয়ে থাকি। সেটি হলো দুর্ঘটনার সব দায় কেবল গাড়ি চালকের।
সড়ক পরিবহণ আইন (২০১৮) ঃ ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই, ঢাকার বিমান বন্দর সড়কে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ফলে সরকার দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক দোষারোপের অবসান ঘটিয়ে ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮ প্রনয়ন এবং সড়ক পরিবহণের সাথে যুক্ত শ্রমিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে এই আইন কার্যকর করে। ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে কার্যকর সড়ক পরিবহণ আইন (২০১৮), ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ৪৭ নং আইন হিসেবে সংসদে সড়ক পরিবহণ আইন পাশ করার পর ৮ অক্টোবর ২০১৮ তা রাষ্ট্রপতির সম্মতিলাভ করে। ২০২২ সালের নভেম্বরে বিধি প্রণয়ন শেষে চুরান্ত কার্যকর করা হয়েছে। তরিঘরি করে করা সড়ক আইন ২০১৮-এ স্পষ্টতই দুর্ঘটনার সকল দায় শ্রমিকের উপর চাপিয়ে শাস্তি ও জরিমানার বিধান করা হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ৫৪টি সংজ্ঞা এবং ১২৬টি ধারাকে ১৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। চালকের মনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা দিয়ে শাস্তির বিধান হলে সতর্কতা বাড়ে অন্যথায় সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। তাতে ঝুঁকি বাড়ে। একটি গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ আইন আমরা চাই যা সড়কে শৃঙ্খলা ও যাত্রীর নিরাপত্তাই শুধু নয় শ্রমিকদেরও আইনি সুরক্ষা দেবে। যে আইনে বিআরটিএ সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, পুলিশি হয়রানি, মালিকদের বেআইনি কার্যকলাপ ও শ্রম আইন না মানা, পথচারী ও যাত্রীদের আইন না মানা এবং শ্রমিকদের দায়িত্ব পালন সব কিছুকেই বিবেচনার আওতায় আনা হবে।
অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে দুর্ঘটনায় ও সাজার ওপর। কিন্তু সমান গুরুত্ব দেয়া দরকার শৃঙ্খলার উপর, যাত্রীর নিরাপত্তা ও শ্রমিকের সুরক্ষার উপর। দুর্ঘটনারও একটা সংজ্ঞা থাকা দরকার। দুর্ঘটনার তো সাজা হতে পারে না। আইন মানে নিয়মের শাসন। যে নিয়ম মানুষের স্বচ্ছন্দ বিকাশ ও সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করে আর এর সামনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে। জনগণের সেবা সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যে আইন রচিত হয় তা হয় গণতান্ত্রিক। আর মুষ্টিমের স্বার্থে জনগণের স্বার্থ সেবাকে কম গুরুত্বে রেখে যে আইন হয় তা অগণতান্ত্রিক। সড়ক পরিবহণের সাথে চালক, মালিক, বিআরটি-এ কর্তৃপক্ষ-সরকার, যাত্রী, পথচারী-সাধারণ জনগণ, সড়কের ব্যবস্থাপনা-অবকাঠামো, চালক, প্রশিক্ষণ, চাকরির বিধি, দুর্ঘটনা তদন্তের প্রক্রিয়া, সড়ক নির্মাণ, ডিজাইন ও ব্যবহার, ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ আইন-আদালত ইত্যাদি অনেক কিছু যুক্ত আছে। সড়ক আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে আনা হলো না। শ্রম আইনের আওতায়সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষকে না আনলে আইন কার্যকারিতা সম্পন্ন হবে না। কি কি কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তা যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তি বিধান বা ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়ানোর পথ বের করা সম্ভব হবে।
দুর্ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং শাস্তির লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করা হলে তা দিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হয় না। অপরাধীরা যে কোন অপরাধ করতে হলে পরিকল্পনা মাফিক করে কিন্তু দুর্ঘটনার কি কোন পরিকল্পনা থাকে? তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শাস্তির বিধান করতে আইন যা করা হোল তাতে দুর্ঘটনাকে আসলে অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সে কারনেই দেখা যাচ্ছে যে, ১২৬ ধারা সম্বলিত সড়ক পরিবহণ আইনে ৫১ টি ধারা প্রবর্তন করা হয়েছে যেখানে শাস্তির বিধান আছে। একাদশ অধ্যায়ে আছে অপরাধ, বিচার ও দন্ড। এই অধ্যায়ে ৪১ টি ধারা আছে আর ত্রয়োদশ অধ্যায়ে অপরাধ, পুলিশের ক্ষমতা এখানে ধারা আছে ১০টি। অর্থাৎ ৫১ টি ধারা সরাসরি শাস্তি সম্পর্কিত। এর বাইরেও আরও কিছু ধারা আছে যা দিয়ে শাস্তি দেয়া যেতে পারে।
সড়কে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, সময়ের অপচয় প্রভৃতি বিষয় নিয়ে সকলেই উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকেন। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কমপক্ষে ৩ কোটি মানুষ প্রতিদিন যাতায়তের জন্য কোন না কোন যানবাহন ব্যবহার করেন। দেশের কৃষি, শিল্প, সেবা খাতের পণ্য, নির্মাণ সামগ্রী পরিবহণ প্রভৃতি কাজে ছোট, হালকা, মাঝারি, বড়, ভারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহৃত হয় প্রতিদিন। ফলে সড়কে নিরাপত্তা সকলেরই মনোযোগ ও বিবেচনার দাবী রাখে। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে দেখা যায় প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষের মৃত্যু এবং ৫০ জন মানুষ আহত হয়ে থাকেন সড়ক দুর্ঘটনায়। এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব কারনেই সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ নীতিমালা খুবই প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করণীয় ঃ
১. সর্বপ্রথম পরিবহণ শ্রমিকদের“শোভন কাজ” তথা ন্যায্য মজুরী, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সবার জন্য সামাজিক সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সামাজিক বন্ধন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হবার অধিকার এবং সবার জন্য সমান সুবিধা এবং আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের ভাবমূর্তির যে সংকট তা দূর করে সম্মানের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২. চালকদের কাছ থেকে ভালো সেবা আশা করলে তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নিশ্চিত করতে হবে। চালকরা যেখান থেকে যাত্রা শুরু করবে বা শেষ করবে সেখানে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. ষ্ট্রেস মেনেজমেন্ট এখন সড়ক শ্রমিকের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাস এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় শ্রমিকদেরষ্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের উপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৪. সড়কের যানবাহন, যানবাহনগুলোরগতি-প্রকৃতি, ফিটনেস (চলন সামর্থ্য), ফিটনেস প্রদানকারির এবং প্রতিষ্ঠানের যথার্থ দক্ষতা, চালকের লাইসেন্স, চালকের মানসম্মত ট্রেনিং, সড়ক ও যানবাহনের অনুপাত, পার্কিং বা পরিসর, পথচারীদের চলাচল গতিবিধি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় সিগনাল ও গণঅভ্যস্থতা শহরে-নগরে আর সড়ক-মহাসড়কে বহুমাত্রিক যাতায়ত ব্যবস্থা ইত্যাদি ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দুর করতে হবে।
৫. সড়কে পরিবহণ শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সড়ক আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে আনতে হবে। সড়ক আইন ২০১৮ সংশোধন করে সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৭. অধিকাংশ দুর্ঘটনার কারণই নীতমালার ব্যর্থতা, অতএব নীতিনির্ধকরা সর্বদা চেষ্টা করেন তা গোপন রাখার জন্য। কাজেই বিআরটিএ, পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথ এর সদস্যদের বাদ দিয়ে দক্ষ, স্বাধীন/স্বতন্ত্র এবং পেশাদারদের নিয়ে তদন্ত কমিটি পুনগঠিত করে রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তের প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। দুর্ঘটনার তদন্ত করে মুল কারণ বা "রুট কজ" খুঁজে বের করে তার প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
৯. যে কোন যানবাহন চালানোর জন্যই প্রয়োজন তাত্ত্বিক জ্ঞান, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিজ্ঞতা। আমাদের চালকদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কোন ঘাটতি নাই কিন্তু তাত্ত্বিক জ্ঞানের অভাব আছে। তাদের তত্ত্বগত জ্ঞানের শিক্ষা দিতে হবে। এক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনৈতিকতার সাথে যুক্ত লোক প্রশিক্ষক হলে তা কখনোই কাজে আসবে না।
১০. সড়কের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য সড়ক সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে একটা ব্যবস্থাপনার অধিনে ও যথোপযোগী প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে নিয়ে আসতে হবে। শ্রমিকদের পরিচয়পত্র, গাড়ির ফিটনেস, বৈধ কাগজপত্র পরিবহণ শ্রমিকদের নিশ্চিত করতে হবে।
১১. নিয়োগপত্রটা শুধু একটা কাগজ নয় এটার সাথে তার শৃঙ্খলা ও জীবনের নিশ্চয়তা জড়িয়ে আছে।শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দিয়ে শৃঙ্খলায় আনতে হবে। প্রতি ট্রিপে ইনসেন্টিভ এর ব্যাবস্থা করে রক্ষনাত্নক গাড়ি চালনায় অভ্যস্ত করতে হবে।
১২. দূরপাল্লার যাত্রায় বিকল্প চালক, ৫ ঘন্টার বেশী গাড়ি চালনা নয়, যাত্রাপথে বিশ্রামাগার, রাস্তা পারাপারের ব্যাবস্থা এবং প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন করতে হবে। চালকদের জন্য হাইওয়ের পাশে এবং টার্মিনালে মানসম্মত বিশ্রামাগার নির্মাণ করে বিশ্রামের ব্যাবস্থা করতে হবে।
১৩. কোনো হাইওয়ে ও এক্সপ্রেক্সওয়ে নির্মাণের পূর্বে ও পরে রোড সেইফটি অডিট করতে হবে এবং রোড সেইফটি মেনেজমেন্টের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
১৪. একটা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পর শুধুমাত্র চালকের উপর দায় চাপানোর প্রবনতা পুলিশ, সংবাদ মাধ্যম এবং তদন্ত কমিটির কর্তাব্যাক্তিদের মধ্যে বিদ্যমান। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্ঘটনার রির্পোটগুলি প্রচার করার সময় ড্রাইভার কেন্দ্রিক ধারণাগুলি বন্ধ করতে হবে। অনেক সময় এটা আরও বেশী প্রাণহানির কারণ হয়ে দাড়ায়।
১৫. বিআরটিএ ও পুলিশের দুর্ণীতি, হয়রানি বন্ধ করে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
১৬. পরিবহণ শ্রমিকদের লোভনীয় হেন্ডসাম বেতন, ইনসেন্টিভ ও ঝুঁকি ভাতা এর ব্যাবস্থা করতে হবে।
১৭. লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ করতে অন রোড টেস্টিং এর মাধ্যমে চালককে ক্যাটাগরি ভিত্তিক লাইসেন্স দিতে হবে।
১৮. সরকারি খরচে প্রত্যেক জেলায় চালকের ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। বিআরটিএ-এর তালিকাভুক্ত ইনিস্ট্রাক্টর বাদ দিয়ে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত ইনিস্ট্রাক্টর দিয়ে চালকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। চালকদের সামগ্রিক বিষয়ে শিক্ষিত করার জন্য রাষ্ট্রকে খরচ বহন করতে হবে। নিরাপদ সড়ক ও জীবন রক্ষার তাগিদেএটা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো ভর্তুকী হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে।
উপসংহার ঃ সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষন প্রদান, ভূল সংশোধনের উদ্যেগ এবং শাস্তি প্রদান এসব কিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই সড়কে শৃঙ্খলা অনেকটা নিশ্চিত করা সম্ভব। নিরাপদ সড়কের জন্য সমন্বিত একটি কার্যকর কৌশল প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সবার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে চালকেরা বলির পাঠা কিংবা সোশ্যাল ক্রসফায়ারে পড়তেই থাকবেন, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা কখনো হ্রাস পাবে না। আর ৫০ লাখ পরিবহণ শ্রমিককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাদের অপরাধী চিহ্নিত করে কখনোই তাদের শৃঙ্খলায় আনা যাবে না।
সম্পাদনা ঃ মো. সেলিম
পরিবহণ শ্রমিক ও প্রধান সমস্বয়ক